আর্টিকেল ১১

বৈষ্ণব কবি চন্ডীদাসের স্মৃতি জড়িয়েই গড়ে উঠছে নানুর

বৈষ্ণব কবি চন্ডীদাসকে নিয়ে বিতর্ক যতই থাকুক না কেন নানুর‌ই যে পদাবলীর কবি চন্ডীদাসের কর্মক্ষেত্র ছিল সে কথা আজ তর্কাতীত। নানুরের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে আছে চন্ডীদাসের অজস্র স্মৃতি। যদিও পশ্চিমবঙ্গে অজস্র পর্যটন কেন্দ্রের পাশে চন্ডীদাস নানুর স্থান করে নিয়েছে  তবুও হয়তো সাধারণ পর্যটকদের চোখে নানুরের অতটা গুরুত্ব নেই । কিন্তু একজন সচেতন ভ্রমন পিপাসুর কাছে চন্ডীদাসের নামটাই যথেষ্ট, তাই শান্তিনিকেতন ভ্রমণ এর পাশাপাশি একটা দিন নানুর ঘুরে যাওয়া যেতেই পারে। বোলপুর বর্ধমান থেকে অসংখ্য বাস যাতায়াত করছে প্রতিনিয়ত তবে পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো স্থান থেকে যেতে হলে বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে বাসে সরাসরি নানুর বা ছোট কোন গাড়ি ভাড়া করে নানুর যাওয়া যেতে পারে। থাকার জন্য স্থানীয় দু-একটি লজ ও একটি সরকারি অতিথিশালা থাকলেও যেহেতু কাছাকাছি শান্তিনিকেতনের অবস্থান সেক্ষেত্রে সেখান থেকেও ঘুরে যাওয়া যেতে পারে। তবে মধ্যাহ্নভোজন এর জন্য নানুরের হোটেলগুলি কিন্তু মন্দ নয়।
             চৈতন্য পূর্ববর্তী কবি চন্ডীদাসের আরাধ্যা দেবী মা বিশালাক্ষী মন্দির ও পার্শ্ববর্তী বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বিশেষত মন্দিরগুলি টেরাকোটার কাজ লক্ষণীয় দেওয়ালগুলোতে ফুটে উঠেছে দশাবতার, শ্রীকৃষ্ণ জন্ম সহ পুরান ভিত্তিক বিভিন্ন কাহিনী। এছাড়াও মন্দিরে অপূর্ব কারুকার্য দেখার মতো। পুরাতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই স্থানের  উত্তর-পশ্চিম কোণে একই রকম একটা মন্দির আছে যার দরজার মাথায় দেওয়ালে  অদ্ভুত লিপি চোখে পড়ে। পাশেই উঁচু টিলার মত একটি ধ্বংসাবশেষ যে ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে আপনি অনুভব করতে পারবেন এর প্রাচীনত্ব।  কথিত আছে চন্ডীদাসের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন শাসকদের দ্বারা সৃষ্ট এ ধ্বংসস্তূপ । এক সময় এই ধ্বংসস্তূপে খননকার্য চালানো হয় তখন এখানে উদ্ধার হয় কিছু প্রাচীন সামগ্রী সহ একটি নর কঙ্কাল যার  উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় ফুট। তারপর আর খননকার্য চালানো হয়নি যদিও স্থানীয়রা দাবি করেন এখানে খননকার্য চালালে অনেক রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। হয়তো আগামী দিনে তা সম্ভব হবে। ধ্বংসস্তূপের উপর একটি সুউচ্চ শিমুল গাছ  মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সেখানকার অতন্দ্র প্রহরী রূপে। নানুর থানা সন্নিকটে আছে একটি বড় পুকুর যার নাম দেহেতা, পূর্ব পশ্চিমে লম্বা  পুকুরটি দেখে অনেকেই বলেন এটি আসলে প্রাচীন নদীর খাত বা 'দ' আর তা থেকেই দেহেতা। দেহেতাকে ঘিরে চন্ডীদাসের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে শোনা যায় নানুরের আকাশে বাতাসে । চন্ডীদাসের সাধন সঙ্গিনী রজকিনী রামী, তার পেশাগত কাজ, জামা কাপড় পরিষ্কার করতেন এর জলে। দেহেতার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে  দেবী রক্ষাকালী মন্দিরের পাশে একটি পাটা আকৃতির প্রস্তর খন্ড যেটিকে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন রামীর কাপড় কাচা পাটা বলে। সরকারি অতিথিশালাটি এই রক্ষা কালী মন্দির প্রাঙ্গণেই।
             শুধু চন্ডীদাস সম্পর্কিত নয়  নানুরকে কেন্দ্র করেই এমন কিছু স্থান আছে যে স্থানগুলি সাথে ধর্মমঙ্গলের সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়। নানুর সংলগ্ন গ্রাম সাকুলীপুর সেরকমই এক গ্রাম। এখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে উচকরণ। গ্রামটির প্রাচীন নাম ছিল বাসুদেব নগর, ধর্মমঙ্গল এর এক রচয়িতা ও ধর্মরাজের প্রচারক হৃদয়রাম সাউ-এর বাসস্থান ছিল বলে মনে করা হয়। সেখানেই আছে ধর্মমঙ্গল খ্যাত চাঁদ রায় নামে এক ধর্মরাজের মন্দির। এছাড়াও টেরাকোটার কাজ করা বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির এই গ্রামেও আছে, সময় পেলে ঘুরে আসা যেতেই পারে। একই রকম ভাবে যাওয়া যেতে পারে নানুর এর উত্তরে আট কিলোমিটার দূরে কীর্ণাহার, যেখানে চন্ডীদাসের সমাধিস্থল বলে মনে করা হয় এবং তার প্রমাণ স্বরূপ এখানেও একটি ছোট ধ্বংসস্তূপ আছে ধ্বংসস্তূপ এর উপরে একটি ছোট্ট মন্দির সেটি  চন্ডীদাসের সমাধিস্থল বলেই বিশ্বাস করা হয়। কীর্ণাহারেই এক সময় মুসলমান শাসকরা তাদের রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। আর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমি এই কির্ণাহার লাগোয়া মিরাটি গ্রামে। তবে বোলপুরের রাস্তায়  নানুর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে বেলুটি নামক গ্রামটিতে  আছে একটি সরস্বতী মন্দির। এলাকাবাসী মনে করেন এই দেবী মহাকবি কালিদাসের আরাধ্যা দেবী, সামনেই মহাকবি কালিদাসের নামাঙ্কিত একটি উচ্চ বিদ্যালয়‌ও আছে। সব মিলিয়ে নানুর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের চিন্তাভাবনা অনেকটাই চন্ডীদাস কেন্দ্রিক। তারা এখনো চন্ডীদাসকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, চন্ডীদাস এখানকার আকাশে বাতাসে, আর তাই এই স্থান আগামী দিনে পর্যটন মানচিত্রে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে বলে স্থানীয়রা আশাবাদী।


দেবাশিস পাল
সাহিত্য কর্মী
paldebashis20@gmail.com

Comments

Popular Posts