ইন্দ্রপুজোর স্থানের মাটি নিয়েই শুরু হয় লোক উৎসব 'ভাঁজো'


সম্পাদকীয় প্রতিবেদন, মাটির খবর:বাংলার স্থান বিশেষে মাসে মাসে পালিত হয় নানান ব্রত,অনুষ্ঠান ও লোকাচার।ভাদ্রমাসে ভাদুগানের কথা তো সর্বজনবিদিত, কিন্তু এই মাসের আরও একটি আঞ্চলিক লোক‌উৎসব ক্ষীণ হতে হতে এখনো টিকে আছে,যেটি মূলতঃ বর্ধমান, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ জেলার কিছু অংশে দেখা যায়। কৃষিপ্রধান বঙ্গদেশের কৃষিকেন্দ্রিক বিভিন্ন পার্বনের মধ্যে আজ ইন্দ্রপুজো ও ভাঁজো নৃত্য অন্যতম। সাধারণভাবে, কৃষি ও ফসলের দেবতা দেবরাজ ইন্দ্রকে তুষ্ট করার জন্যই এই পুজো আর তা থেকে শুরু হয় ভাঁজো নৃত্য, মূলতঃ কুমারী মেয়েদের নৃত্যোৎসব। ভাদ্রমাসের ইন্দ্র দ্বাদশী তিথিতে ইন্দ্রপুজোর মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা। ঐদিন বিভিন্ন স্থানে দেবরাজ ইন্দ্রের প্রতীক হিসেবে রাজছত্র ও রাজদণ্ডের পুজো হয়,তারপর সকলে মিলে একরকম কৃত্রিম লড়াই করে সেখানকার মাটি লুঠ করে বা সংগ্রহ করে, এই ধারা বজায় আছে নানুরের চিৎগ্রামে।আবার লাভপুরের বড়গোগার মতো কিছু কিছু স্থানে শোভাযাত্রা সহকারে মেয়েরা গান করতে করতে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বৃক্ষ প্রদক্ষিণ করে ও মাটি সংগ্রহ করে।তবে উভয়ক্ষেত্রেই সংগৃহীত মাটির সাথে ইঁদুরের গর্তের মাটি,বালি ইত্যাদি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শস্যবীজ পাত্রে অঙ্কুরিত হতে দেওয়া হয়,একে বলে 'শোস্ পাতা'।আর এই শস্য অঙ্কুরিত হলে তাকে কেন্দ্র করে  সপ্তাহ শেষে শুরু হয় নৃত্যানুষ্ঠান যার নাম 'ভাঁজো নাচ' অনেকেই বলেন যে শরীর সামান্য ভাঁজ করে এই নৃত্য করা হয় তাই ভাঁজো আবার কেউ কেউ বলেন ভাদ্র থেকেই ভাঁজোর উৎপত্তি। এদিকে লোকশ্রুতি অনুযায়ী দেবরাজ তার পুজো প্রচলনের জন্য‌ এক দেবনর্তকীর সাহায্য নেন,আর সেই নর্তকীই ভাঁজোদেবী । ইন্দ্রপুজো সম্পর্কে অনেকে বলেন এই তিথিতে ইন্দ্র দেবলোকের রাজা হয়েছিলেন , তাই এদিন বৃষ্টি হলে এখনো বয়স্কদের বলতে শোনা যায়, ইন্দ্রের রাজত্বলাভে তার সৎ মা কাঁদছে, তবে সেটা কতটা পুরাণসম্মত তা তর্কের বিষয় হলেও মানুষের বিশ্বাস ও আঞ্চলিক লোকাচার‌ই বোধহয় বঙ্গলোকসংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর তাই ভাদ্রমাস জুড়ে রাঢ় বাংলার আকাশ বাতাস  আজও মেতে ওঠে ভাজোগানের সুরে।নিজ হাতে মাটি সংগ্রহ থেকে,শষ্য অঙ্কুরিত করার পর মহিলারা নিজেরাই সমস্ত আচার অনুষ্ঠান সেরে নিজেরাই গান ধরে-

'ভাঁজো লো কলকলানি,

মাটি লো সরা,

ভাঁজোর গলায় দোব মোরা

পঞ্চফুলের মালা।'

 যেন এক অনন্য পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে সেই অপরূপ নৃত্যশৈলী যেন রাঢ় বাংলার নিজস্বতা বহন করে চলেছে যুগ ধরে।তবুও যেন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এই ধরনের কৃষিজ,তথা মহিলা লোকাচার গুলো।তবে  আমাদের মূল ভিত্তি যেহেতু কৃষি,তাই এই ধরনের কৃষিজ লোক উৎসবগুলোর কিছুটা বিবর্তন ঘটলেও যুগ যুগ ধরে যে টিকে থাকবে সেব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী আমরাও।

 -------------------------------------------

Debashis Pal,Editor,Matir Khabor


#Editorial_Matir_Khabor


Comments

Popular Posts