শুধুমাত্র নেতাজি অনুগামীই নন, আজাদ হিন্দ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলেছেন কীর্ণাহারের দেবনাথ দাস
দেবাশিস পাল:সমগ্র বীরভূম জেলার মধ্যে প্রাচীনত্বে,শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে অন্যতম স্থান কীর্ণাহার।এখনো এখানকার উত্তর পাড়ায় গেলে দেখা মেলে সারি সারি বহু পুরোনো প্রাসাদপম জমিদার বাড়ি।এরকমই কোন এক বাড়িতেই ১৯০৪ খ্রীঃ ২১শে জানুয়ারী জন্মগ্রহন করেন বীরভূমের গর্ব, নেতাজীর অন্যতম বিশ্বাসভাজন অনুগামী এবং আজাদ হিন্দ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য দেবনাথ দাস, উপেন্দ্রলাল দাস ও পরমেশ্বরী দেবীর চতুর্থ ও কনিষ্ঠ পুত্র।শরীরে জমিদারি রক্ত বইলেও জমিদারির তথাকথিত অহংবোধ তাঁর মধ্যে ছিটেফোঁটাও ছিল না।মন কাঁদত গরীব দুঃখী আর্তের জন্য।তিনি কীর্ণাহার শিবচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে দেশমায়ের শৃঙ্খল মোচনের জন্য,স্বদেশী আন্দোলনের যে জোয়ার উঠেছিল, তা তার মনকে নাড়া দিত বাল্যকাল থেকেই। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে খদ্দরের কাপড় বিক্রি করতেন।তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা উদ্বুদ্ধ করতো যুবকদের।পরে তিনি যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির অনুপ্রেরণায়, নিজের গ্রামে অর্থাৎ কীর্ণাহারে ১৯৩৬-খ্রীঃ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তরুণ সমিতি,যার লোগো তিনি নিজে তৈরি করে এনেছিলেন লাহোর থেকে,আর এই লোগোটির মধ্যে রয়েছে অখণ্ড ভারতের মানচিত্র।তখন তিনি তরুণ সমিতির জন্য লাহোর,করাচি থেকে যে সমস্ত সামগ্রী এনেছিলেন তার মধ্যে একটি বিউগল আজও সযত্নে রক্ষিত আছে ।সেই সময় শরীরচর্চা, সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি এখান থেকেই এই এলাকার যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা হতো।পরে ১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময় নোয়াখালি থেকে অজস্র শরণার্থী শুধু দেবনাথ দাস এবং আজাদ হিন্দ বাহিনীর উপরে ভরসা রেখে কীর্ণাহারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর তাঁদের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে ছিল দেবনাথ দাস প্রতিষ্ঠিত এই কীর্ণাহার তরুণ সমিতি ।
দেবনাথ দাস কর্মসুত্রে জাপানে যান এবং সেখানে রাসবিহারী বসুর সঙ্গে পরিচয় হয় এরপর ১৯৪১ খ্রীঃ নেতাজীর ডাকে আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যোগ দেন।পরে আজাদ হিন্দ সরকার গঠন হলে তিনি নেতাজীর পরামর্শদাতা ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব পান।দীর্ঘ এই লড়াইয়ে দেবনাথ দাস সব সময় সুভাষচন্দ্র বসুর পাশে থেকেছেন। আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিপর্যয়ের পরে দেবনাথ দাস ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েছেন। পরে দেশবাসীর আন্দোলনের চাপে তিনি মুক্তিও পান,তারপর বেশ কয়েক বার তিনি জন্মভূমি কীর্ণাহারে এসেছিলেন।১৯৭৫ খ্রীঃ ৪ ঠা জানুয়ারি তাঁর জীবনাবসান হয়।কীর্ণাহার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তাঁর মুর্তি এবং বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রামের ভিতর হয়ে হাইস্কুল পর্যন্ত রাস্তাটির নামকরন করা হয়েছে তাঁর নামে।তবে এলাকার বহু মানুষ মনে করেন দেবনাথ দাসকে নিয়ে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে,যাতে বর্তমান প্রজন্ম তাঁর কথা এবং তাঁর আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারে ও উদ্বুদ্ধ হতে পারে। স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষ পূর্তিতে আমরা সেই মহান দেশপ্রেমিকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছি ও এলাবাসীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে একই দাবি জানাচ্ছি প্রকৃত মূল্যায়ন হোক দেশপ্রেমিক দেবনাথ দাসের।
-------------------------------------------
Debashis Pal, Editor Matir Khabor
Comments
Post a Comment