বাংলা চাষীরা আজও  শুধুমাত্র আশায় বাঁচে

গ্রীক পুরাণের প্যান্ডোরার বাক্সের গল্পটা জানেন না এমন ব্যক্তি খুব কমই আছে।কাহিনীর আলোচিত বাক্সটি থেকে সবশেষে  বের হয়ে আসে আশা। সেই আশা কে ভরসা করেই মানব সমাজ নাকি, দুঃখ জ্বালা যন্ত্রণা সবকিছু ভুলে থাকে। সকল মানুষ ভুলে থাকে কিনা জানিনা,তবে বাংলার কৃষক সমাজ যে আশাতেই বাঁচে এটা নিশ্চিত, আর নিশ্চিত বলেই হয়তো গ্রাম বাংলায় একটা প্রবাদ আছে 'আশায় বাঁচে চাষা।'  মাফ করবেন চাষা শব্দটা আপনি হয়তো ঠিক মেনে নিতে পারলেন না।তবে জানিয়ে রাখি আমি নিজে একজন কৃষিজীবী পরিবারের সন্তান। আমার বাবা একজন নিজের হাতে ক্ষেতে  কাজ করা চাষী, আমি তাকে কখনো দেখিনি ছাতা নিয়ে জমির মাথায় বসে থেকে চাষ করাতে। কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি, আর সেটা প্রতিনিয়ত করে চলেছেন ষাট বছর বয়স পার করেও। তাই ছোট থেকেই আমার চাষের মাঠে যাওয়া-আসা। নিজে কখনো চাষের কাজে সেভাবে হাত না লাগালেও খুব কাছে থেকে দেখেছি গ্রামের চাষীদের অক্লান্ত পরিশ্রম।নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক এই মানুষগুলি আজ যেন তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে বসেছে, তাই আজ আর কোন চাষীই চায়না যে তার  উত্তর পুরুষরা চাষের সঙ্গে যুক্ত থাকুক। এর পিছনের প্রকৃত কারন খুঁজে বের করতে গেলে আমাদের একটি সামান্য হিসাব করতে হবে, আমি আবার এই হিসেবে একটু কাঁচা, তাই সাহায্য নিলাম কয়েকজন বর্ষীয়ান চাষীর।এক বিঘা জমি চাষের উপর হিসাব করে তার  লভ্যাংশ বের করলাম।চাষীদের হিসেব অনুযায়ী এক বিঘা জমিতে বর্তমানে ট্রাক্টরে চাষ দিতে খরচ হয় প্রায় ১০০০ টাকা,সার লাগে ৫৫০ টাকা, জমি রোয়াতে শ্রমিক খরচ হয় ২০০০ টাকা, নিরান দিতে ৩০০ এবং চাপান জোড়া বা সার দিতে খরচ হয় মোটামুটি ১৫০ টাকা এবং কীটনাশক লাগে প্রায়৩০০টাকার। এরপর জমির রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় প্রতিনিয়ত, তার জন্য ২০০ টাকা ধরে নিয়ে এবং সবশেষে সেই জমির ধান কেটে বাড়ি  নিয়ে যাওয়ার খরচ মোটামুটি ৪০০০ টাকা ধরলে এক বিঘা জমির ধান বাড়িতে নিয়ে যেতে মোট খরচ হয় প্রায় ৮৫০০ টাকা। এর উপর আবার আছে অনাবৃষ্টির আশঙ্কা, তাহলে জমির ধান বাঁচিয়ে রাখার জন্য গাঁটের কড়ি খরচ করে আবার জলসেচের ব্যবস্থা করতে হয়, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে বৃষ্টির অভাবে ঠিকঠাক বীজ নাহলে সেটাও কিনে নিতে হয়। এখানেও চাষী কিন্তু 'যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ' এই বাক্যে বিশ্বাসী, তাই সে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়তে প্রস্তুত নয়। এই হিসেবে না হয় জলসেচ বাবদ খরচের দিকটা বাদই দিলাম। তবে বাকি খরচটা প্রত্যেক বছরই ক্রমবর্ধমান, চাষীরা কিন্তু এই খরচ করেন  শুধুমাত্র আশার উপর নির্ভর করেই কারণ এরকম কোন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না, নির্বিঘ্নে সমস্ত ধান বাড়িতে ঢুকে যাবে। বিধি যদি বাম হন তাহলে কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। বিগত বছরে অধিকাংশ সময় ধানের দাম পাওয়া গেছে কমবেশী ১৩০০ টাকা সে ক্ষেত্রে এক বিঘা জমিতে মোটামুটি নয় কুইন্টাল ধান উৎপাদন ধরে নিলে, ধান বিক্রি করে পাওয়া গেছে ১১৭০০টাকা অর্থাৎ লাভ হচ্ছে মাত্র  ৩২০০টাকা। দশ বিঘা জমি চাষ করে কমবেশী ত্রিশ হাজার টাকা উপার্জন করে গোটা বছর সংসার চালানো একটু কষ্টকর নয় কি? এখানে হয়তো অনেকেই বলতে পারেন গতবছর সরকার সহায়ক মূল্যে ধান কিনেছে কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন তা অতি সামান্য।আবার সরকার মাঝেমধ্যে ক্ষতিপূরণ দিলেও অধিকাংশ অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত চাষী সঠিক কাগজ পত্রের অভাবে তা থেকে বঞ্চিত‌ই রয়ে গেছেন। হয়তো সংশ্লিষ্ট দপ্তর চাষীদের প্রতি একটু সহানুভূতি দেখালে এ সমস্যা দূর হবে।কিন্তু চাষী ছাড়বার পাত্র নয় তারা কিন্তু বেঁচে থাকবে সেই আশাতে ভর করেই। আর এদিকে বিভিন্ন পেশার লোক জনেরা তাদের পাওনা গন্ডা বুঝে নেওয়ার জন্য লড়াই করলেও তারা কিন্তু চুপ করেই থাকবে আর মনের কোণে এই আশাকেও  জিইয়ে রাখবে 'একদিন ধানের দাম বাড়বে, সেবছর আর তার কোন কষ্ট থাকবে না, সে ভালো খাবে ভালো পড়বে।
                  
             এদিকে আবার গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো প্রায় বছর বছর শুরু হয়েছে অনাবৃষ্টি। গত বছর এই বীরভূম জেলায় অনাবৃষ্টির জেরে চাষের জমির একটা বড় অংশ অনাবাদি হিসাবে পড়েছিল,  এবছর এখনো পর্যন্ত অবস্থাও তদ্রুপ।চিন্তার বিষয় এই যে গত বছর এই সময়ের মধ্যে সমগ্র বীরভূমে একটা বড় অংশের চাষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এ বছর তাও হয়নি। অনাবৃষ্টি জেরেই যে এই অবস্থা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পশ্চিমবঙ্গের সেই অর্থে বর্ষা হয়নি বিগত কয়েক বছরে, আর এরকম ভাবে চলতে থাকলে উপরওয়ালা, মুনাফাওয়ালা ও সরকারওয়ালা এই তিনের  চাপে পড়ে চাষী হবে সর্বস্বান্ত, আশা করি এ কথাও সকলেই অনুমান করতে পারছেন। বীরভূম জেলার একটা বড় অংশ সেচ খাল প্রভাবিত, কিন্তু অনাবৃষ্টির কারণে সেখানেও জল অপ্রতুল। গত বছর আশ্বিন মাস থেকেই চাষের জমির ধান বাঁচানোর লক্ষ্যে মেরে ফেলেছিল গ্রাম বাংলার একটি বড় অংশের পুকুর,খাল। আর এইভাবে প্রতিবছর পুকুরের জল তুলে ফেলা হয় তাহলে পশ্চিমবঙ্গেও জল ভর্তি ট্রেন পাঠাতে হবে আগামী দিনে।

            এদিকে বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে স্পষ্টতই বুঝতে পারা যায় শহরে গিয়ে খাদ্যপণ্যের দাম যথেষ্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বুঝতে অসুবিধা হয় না উৎপন্ন খাদ্যশস্যের থেকে একটা বিপুল লভ্যাংশ মধ্যস্বত্বভোগীরা ভোগ করছে, আর শস্য উৎপাদনকারি সেখানে পাচ্ছে খুবই সামান্য। অর্থাৎ খাদ্যশস্যের দাম চাষী যথেষ্ট কম পেলেও পরবর্তীকালে সেই খাদ্যশস্য যখন খাবারে পরিণত হয় তখন কিন্তু তার দাম থাকে যথেষ্ট,তাহলে যথেষ্ট দেখভালের অভাবে একশ্রেণীর মুনাফাখোর গোষ্ঠী বাড়িয়ে চলেছে তাদের মুনাফার পাহাড়, আর প্রকৃত পরিশ্রম করা চাষীরা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে,ফসল উৎপাদন করেও প্রকৃত উন্নয়ন থেকে অবহেলিত রয়ে গেছে। অথচ দেশের প্রায় প্রত্যেকটি বাজেটে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নের ব্যাপারে, সেই উন্নয়ন যে কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে তা যেন আজ প্রশ্নের সামনে। বাস্তবিকপক্ষে এটা বলা যায় এই বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারতবর্ষে কৃষিজীবী সম্প্রদায় যেন ইঁদুর মারার কলে বন্দী।

দেবাশিস পাল
সাহিত্যকর্মী
Mob.7980435654
paldebashis20@gmail.com

Comments

Popular Posts