রাঢ় বাংলার এক বিরল চরিত্রের উদ্যোগপতি  অমরচাঁদ কুণ্ডু

বাঙালিরা শিল্পের প্রতি অতটা আগ্রহী নয় ঠিক যতটা আগ্রহ প্রকাশ করে চাকুরীর প্রতি। কথাটা উঠেছিল বাংলার অন্যতম সফল ব্যবসায়ী তথা উদ্যোগপতি অমরচাঁদ কুন্ডুর জন্মভূমি জ্ঞানদাস কান্দরা-স্থিত অফিসে। তিনি বললেন, 'আমরা বোধহয় ছোট থেকেই সেই অর্থে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে লড়াই করতে অভ্যস্ত নয় আমরা চাই আমাদের অভিভাবকরা ব্যবসা বা শিল্পের ক্ষেত্রটা পুরোপুরি তৈরি করে দিক।অথবা পৈতৃক কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা,যা  নিয়ে ব্যবসায় নামা যায়। সেই অর্থে শূন্য থেকে শুরু করার সাহসিকতা বাঙালি সন্তানরা দেখাতে পারে না বলেই হয়তো ব্যবসা বা শিল্পের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও আমরা পিছিয়ে পড়েছি।' বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হয়ে পারলাম না কারন এক্ষেত্রে কিন্তু শূন্য থেকে শুরু করার মতো সাহসী ব্যক্তিরাই বেশি সফল।আর তার উদাহরণ হিসেবে খাড়া করা যায় ভারতবর্ষের তাবর তাবর শিল্পপতিদের।তবে তার আর প্রয়োজন হবে না কারন প্রকৃষ্ট উদাহরণ তো অমরচাঁদ কুণ্ডু নিজেই,আর আদ্যপান্ত বাঙালি এই মানুষটি যে স্বক্ষেত্রে অন্যতম সফল ব্যক্তি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে তার এই সাফল্যের সুত্রটা ঠিকঠাক বুঝতে হলে অবশ্যই আমাদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে তাঁর জীবনের ঘটনাবলী।

                         ইংরেজ শৃংখল মুক্ত হ‌ওয়া স্বাধীন ভারতবর্ষ তখন‌ও হয়তো ভালো করে হাঁটতেই শেখেনি এমন এক মুহুর্তে জন্মগ্রহণ করেন অমরচাঁদ কুণ্ডু।সালটা ১৯৫৪ খ্রীঃ,৯ ই সেপ্টেম্বর বৈষ্ণব পদকর্তা  জ্ঞানদাসের জন্মভূমি অধুনা পূর্ববর্ধমান জেলার কান্দরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।পিতা রাধাকান্ত কুণ্ডু মা শ্যামাঙ্গিণী কুণ্ডু। ছোট থেকেই ব্যবসায়িক পরিবেশে মানুষ তিনি,কারণ পিতা ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ধান্য ব্যাবসায়ী।তবে ব্যবসার মধ্যেও যে সততা, কঠিন শ্রমকে কাজে লাগিয়ে জীবনধারণ করা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন পিতা রাধাকান্ত কুণ্ডু।আর নিজ পিতার এই জীবনদর্শন ছোট থেকেই অনুপ্রাণিত করেছে অমরচাঁদ কুণ্ডুকে‌,পরবর্তীকালে যা তাঁর সাফল্যের সোপান অতিক্রম করতে সহায়ক হয়েছে। গ্রামের স্কুলে গ্রাম্য পরিবেশে পড়াশোনা, খেলাধুলা করে বড়ো হ‌ওয়ার ফলে তিনি প্রকৃতি পরিবেশকে আরও কাছে থেকে দেখতে পেয়েছেন,ভালোবাসতে শিখেছেন মানুষকে। স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করতে করতেই হাতেখড়ি হয়ে যায় ব্যবসার কাজে, পিতার সহযোগি হিসেবে।চলতে থাকে পড়াশুনাও।তবে ধীরে ধীরে আকর্ষিত হতে থাকেন ব্যবসার প্রতি। বর্ধমান জেলার খ্যাতি, ভারতবর্ষ তথা এশিয়ার ধান্যভাণ্ডার হিসেবে,আর এহেন জেলার ভূমিপুত্র হিসেবে ও পিতার ব্যবসা থেকে ব্যবসায়িক শিক্ষা গ্রহণ করার পর ধান ও চালের ব্যবসা যে তাকে টানবে তা তো স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে ব্যবসায় মনোনিবেশ করলেন তিনি এরপর সাতের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধি করতে শুরু করেন। ধান চালের ব্যবসার পাশাপাশি সিমেন্ট, রাসায়নিক সার ও নানান তৈলজাতীয় শস্যের ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন। 'বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী' প্রবাদবাক্যের যেন সফল বাস্তবায়ন ঘটতে শুরু করে অমরচাঁদ কুন্ডুর কাজের মধ্য দিয়ে। ধীরে ধীরে ব্যবসা সম্প্রসারিত করেন বীরভূম-বর্ধমান-মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায়। প্রায় দু দশক মনোযোগ ও একাগ্রতা সহকারে নিজস্ব ক্ষেত্রে কাজ করে যাওয়ার পাশাপাশি আর্তের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটা যেন ধীরে ধীরে নেশায় পরিনত হয়।ব্যবসার ক্ষেত্রে আরও একটা বড়ো গুন তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।আর তাই তিনি ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকেন স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। পুরোনো ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি কান্দরায় চালু করে ফেলেন রাইস মিল,তেলমিল পরবর্তীকালে কীর্ণাহারেও রাইস মিল লিজ নিয়ে চালাতে শুরু করেন।ধীরে ধীরে মুর্শিদাবাদ জেলাতেও শুরু করে ফেলেন কয়েকটি মিল।ভাগ্যলক্ষ্মীও আর্শীবাদে ভরিয়ে তোলেন।একাগ্রতা,সততা অমরচাঁদ কুণ্ডুকে একজন সামান্য ব্যবসায়ী থেকে উদ্যোগপতিতে পরিণত করে।

           তবে শুধুমাত্র একজন সফল উদ্যোগপতিই নয়,তিনি একজন বিরল চরিত্রের অধিকারী। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টি উদ্ধমুখী হলেও, মাটির প্রতি টানটা প্রথম থেকেই।মানুষকে সাহায্য করার নেশাটা উপার্জন বৃদ্ধির পাশাপাশি যেন আরও বেড়ে যায়,আর তাইতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী জনিত পরিস্থিতি লক্ষ্য করে সরকারি তহবিলে নির্দিধায় জমা করেছেন লক্ষ লক্ষ টাকা।রাঢ় বঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার ধর্মস্থানের নির্মাণ, সংস্কারের পিছনে অমরচাঁদ কুণ্ডু বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত। তবে ২০০১ সালে কান্দরা কলেজ তৈরি হ‌ওয়ার পর,বহু ছাত্র-ছাত্রীদের সংস্পর্শে আসেন, আর তাদের দু‍ঃখ বেদনা যেন তাকে আরও ব্যথিত করে তোলে।বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত, দুঃস্থ মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের কখনো আংশিক কখনো সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে শুরু করেন।একে একে তৈরি করেন বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।অর্থ দিয়ে সহায়তা করে মুর্শিদাবাদের নবগ্রামে  তৈরি করান একটি কলেজ, সেখানকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কলেজটির নামকরন করেন 'নবগ্রাম অমরচাঁদ কুণ্ডু কলেজ'।আর‌ও বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে চলেছে আগামীতে। এছাড়াও আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন মেটাতে এতটুকু কার্পন্য করতে তাঁকে দেখা যায় না।আর একটা কথা প্রায়ই বলতে শোনা যায় অমরচাঁদ কুণ্ডুকে,'সমাজসেবার সব থেকে মহান ক্ষেত্র শিক্ষাক্ষেত্র। একটা ছেলেকে প্রকৃত শিক্ষা পেতে সহায়তা করলে একটি পরিবারের উপকারের পাশাপাশি সমাজে উপকৃত হবে।' তাইতো তিনি বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয় করেন বহু অর্থ। প্রত্যেক বছর আনুষ্ঠানিকভাবে শত শত ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দেন আর্থিক সহায়তা থেকে শিক্ষা সামগ্রী। এছাড়াও কয়েকশো দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে পড়াশোনার খরচ যুগিয়ে চলেছেন তিনি,তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ যে আগামীতে স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজের কাজ করে যাবেন তা বলাই বাহুল্য। শুধু শিক্ষা বা ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কাজ করতে আগ্রহী তিনি, ইতিমধ্যে বেশ কিছু সামাজিক সংগঠনের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন  অক্সিজেন সিলিন্ডার সহ অন্যান্য জরুরী পরিষেবার কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী। বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের তিনি নিজ খরচে ডাক্তারী পড়াচ্ছেন,আর সেই সমস্ত ভাবী ডাক্তারদের কাছে শুধু এইটুকু চেয়েছেন যে  প্রতিষ্ঠিত হ‌ওয়ার পর তারা যেন কিছুটা সময় সমাজের দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসার জন্য দেয়। এমনকি তাদের সহযোগিতা পেলে তিনি নিজ খরচে হাসপাতাল তৈরি করতেও পিছপা হবেননা বলেও জানান।

        তবে একজন মানুষ তার উপার্জন যখন অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারেন তখন তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা যে কতটা সদর্থক হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সামাজিক কাজে যে তার উত্তরসূরিরাও এগিয়ে যাবে সে ব্যাপারে আশাবাদী তিনিও। তবুও সমাজসবার জন্য একটি ট্রাস্ট তৈরি করেছেন তিনি,যা আগামীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে যাবে। বিশেষতঃ অর্থের অভাবে দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করতেই  তিনি চান। একজন উদ্যোগপতি যখন ব্যবসা,শিল্পের প্রসার ঘটানোর কাজেই মগ্ন থাকতে পছন্দ করেন, উপার্জনের পাশাপাশি আরও বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাই শ্রেয় বলে মনে করে, সেখানে দাঁড়িয়ে অমরচাঁদ কুণ্ডু গরীব,দুঃখী,আর্তের সেবায় নিয়োজিত রাখতে পছন্দ করেন যিনি সমাজ থেকে মেধা অন্বেষণ করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প করেছেন, মনের মধ্যে সেই আশাটা জিইয়ে রেখে যে,তার দ্বারা তৈরী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,আমলারা সমাজ মেরামত করবে, তখন একজন উদ্যোগপতির বিরল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটাই প্রকাশ্যে আসে।তাই তিনি নিজে এক বিরল দৃষ্টান্ত,আর তার মতো বিরল  চরিত্রের উদ্যোগপতিকে এই সমাজের বড়ো প্রয়োজন।


দেবাশিস পাল
নানুর***বীরভূম
7980435654/9832237959
paldebashis20@gmail.com

               

                   

Comments

Popular Posts