বীরভূমের এক মহারাজা ও বৃটিশ ভারতের একটি আইনি হত্যা
আগস্ট মাস যেন মনে পড়িয়ে দেয় বৃটিশ শাসনের রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা। পলাশীর প্রান্তরে যে বিষবৃক্ষের বীজ বপন করা হয়েছিল তার প্রকৃত স্বরূপ বোধহয় ভারতবাসী অনুধাবন করেছিল এই বীরভূমের এক মহারাজা কে হত্যা করতে দেখে। হ্যাঁ আমরা বলতে চাইছি মহারাজা নন্দকুমারের কথা।যাকে হত্যা করা হয়েছিল তথাকথিত আইনি প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে এই আগস্ট মাসেই। আসুন দেখে নেওয়া যাক কে ছিলেন এই মহারাজ নন্দকুমার।
১৭০৫ সালে বীরভূম জেলার নলহাটি থানার ভদ্রপুর গ্রামে নন্দকুমার জন্মগ্রহণ করেন।পিতার কাছে রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত কাজ শিখে,তিনিও নবাবী আমলে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করেন।
মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬৪ সালে নন্দকুমারকে ‘মহারাজা’ উপাধি প্রদান করেছিলেন।ঐ বছরেই ওয়ারেন হেস্টিংসের বদলে তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্ধমান, নদিয়া ও হুগলির কালেক্টর নিযুক্ত করে।১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর-জেনারেল হয়ে এলে নন্দকুমার তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। মহারাজ নন্দকুমার অভিযোগ করেন যে, হেস্টিংস মীরজাফরের বেগমের কাছে বহু টাকা ঘুষ নিয়ে,সেই অর্থের একাংশ ঘুষ তাঁকেও দিতে চেয়েছিলেন। তিনি এও দাবি করেন যে,অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ তাঁর কাছে একটি চিঠি রয়েছে। মূলতঃ এই ছিল তাঁর অপরাধ।এরপর ১৭৭৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস প্রতিহিংসা বশতঃ নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। ব্রিটিশ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পের অধীনে এই মামলা চলে। ইম্পে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের বন্ধু। মামলায় নন্দকুমার দোষী সাব্যস্ত হন।১৭৭৫ সালের ৫ই আগস্ট কলকাতায় বর্তমান বিদ্যাসাগর সেতুর নিকটে নন্দকুমারকে ফাঁসি দেওয়া হয়।ব্রিটিশ আমলে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয়,যিনি ফাঁসির সাজা পান। ।বহু ঐতিহাসিক এই মত পোষণ করেন যে, মহারাজ নন্দকুমারকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছিল। তাই মহারাজের এই ফাঁসিকে ‘আইনি হত্যা’ বলে থাকেন অনেকেই।
তাঁর জন্মস্থান বীরভূম জেলার ভদ্রপুর গ্রামে তার সম্মানে হাইস্কুল স্থাপন করা হয়েছে। আকালিপুর গ্রামে ব্রাহ্মনী নদীর তীরে তিনি যে বিখ্যাত কালী মন্দির নির্মাণ করেছিলেন,তা ভারতবর্ষের অন্যতম বিখ্যাত কালীমন্দির।পূর্ব মেদিনীপুরে তার সম্মানে মহারাজা নন্দকুমার মহাবিদ্যালয় নামে একটি কলেজ স্থাপন করা হয়েছে।কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে মহারাজা নন্দকুমার রোড এবং পূর্ব মেদিনীপুরের একটি অঞ্চলের নামই হলো নন্দকুমার। তাই একথা বলা যেতেই পারে গভীর ষড়যন্ত্র ও ভয়ঙ্কর পরিণতি সত্বেও মহারাজা নন্দকুমারকে বঙ্গবাসী এখনো ভোলেনি।
দেবাশিস্ পালের রিপোর্ট, মাটির খবর
Comments
Post a Comment