অমরচাঁদ কুণ্ডু-সফল ব্যবসায়ী ও সমাজবন্ধু 



'বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী' এই বাক্যটা বঙ্গবাসী সময়ে অসময়ে যতটা আওড়াতে অভ্যস্ত ততটা হয়তো অন্তর থেকে মানতে রাজি নয়।ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে সাহসের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করার মতো বাঙালি খুঁজে পাওয়াটা বেশ মুশকিল। সেদিক দিয়ে বেশ কিছুটা ব্যতিক্রম অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার বৈষ্ণব পদকর্তা জ্ঞানদাস স্মৃতি বিজড়িত কান্দরার অমরচাঁদ কুণ্ডু,যিনি একরকম শূন্য থেকে শুরু করার সাহস দেখাতে পেরেছেন ব্যবসার ক্ষেত্রে। আর সেই সাহসের উপর ভর করে, আদ্যপান্ত বাঙালি এই মানুষটি যে বর্তমানে স্বক্ষেত্রে অন্যতম সফল ব্যক্তি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে তার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে অমরচাঁদ কুণ্ডুর গভীর নিষ্ঠা, আদর্শ ও জীবনদর্শন।


              ১৯৫৪ খ্রীঃ,৯ ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন অমরচাঁদ কুণ্ডু।পিতা রাধাকান্ত কুণ্ডু মা শ্যামাঙ্গিণী কুণ্ডু। ব্যবসার মধ্যেও যে সততা, কঠিন শ্রমকে কাজে লাগিয়ে জীবনধারণ করা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন পিতা রাধাকান্ত কুণ্ডু।আর নিজ পিতার এই জীবনদর্শন ছোট থেকেই অনুপ্রাণিত করেছে অমরচাঁদ কুণ্ডুকে‌,পরবর্তীকালে যা তাঁর জীবনে সাফল্যের এনে দিতে পেরেছে। গ্রামের স্কুলে গ্রাম্য পরিবেশে পড়াশোনা, খেলাধুলা করে বড়ো হ‌ওয়ার ফলে তিনি প্রকৃতি পরিবেশকে আরও কাছে থেকে দেখতে পেয়েছেন,ভালোবাসতে শিখেছেন মানুষকে। স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করতে করতেই হাতেখড়ি হয়ে যায় ব্যবসার কাজে, পিতার সহযোগি হিসেবে।চলতে থাকে পড়াশুনাও।তবে আকর্ষণ বাড়তে থাকে ব্যবসার প্রতি। ধীরে ধীরে ব্যবসায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করলেন তিনি এবং সাতের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধি করতে শুরু করেন। ধান চালের ব্যবসার পাশাপাশি সিমেন্ট, রাসায়নিক সার ও নানান তৈলজাতীয় শস্যের ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন। 'বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী' প্রবাদবাক্যের যেন সফল বাস্তবায়ন ঘটতে শুরু করে অমরচাঁদ কুন্ডুর কাজের মধ্য দিয়ে।ব্যবসা সম্প্রসারিত করেন বীরভূম-বর্ধমান-মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায়। প্রায় দু দশক মনোযোগ ও একাগ্রতা সহকারে নিজস্ব ক্ষেত্রে কাজ করে যাওয়ার পাশাপাশি আর্তের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটা যেন নেশায় পরিনত হয়।ব্যবসার ক্ষেত্রে আরও একটা বড়ো গুণ তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো চটজলদি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।আর তাই তিনি ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকেন স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। পুরোনো ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি কান্দরায় চালু করে ফেলেন রাইস মিল,তেল মিল পরবর্তীকালে কীর্ণাহারেও রাইস মিল লিজ নিয়ে চালাতে শুরু করেন। মুর্শিদাবাদ জেলাতেও শুরু করে ফেলেন কয়েকটি মিল।ভাগ্যলক্ষ্মীও আর্শীবাদে ভরিয়ে তোলেন।একাগ্রতা,সততা অমরচাঁদ কুণ্ডুকে একজন সামান্য ব্যবসায়ী থেকে উদ্যোগপতিতে পরিণত করে।তবে এর বাইরেও তিনি একজন বিরল চরিত্রের অধিকারী। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টি উদ্ধমুখী হলেও, মাটির প্রতি টানটা প্রথম থেকেই।মানুষকে সাহায্য করার নেশাটা উপার্জন বৃদ্ধির পাশাপাশি যেন আরও বেড়ে যায়,আর তাইতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী জনিত পরিস্থিতি লক্ষ্য করে সরকারি তহবিলে নির্দ্বিধায় জমা করেছেন লক্ষ লক্ষ টাকা।রাঢ় বঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার ধর্মস্থানের নির্মাণ, সংস্কারের পিছনে অমরচাঁদ কুণ্ডু বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত। তবে ২০০১ সালে কান্দরা কলেজ তৈরি হ‌ওয়ার পর,বহু দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের চোখের সামনে দেখতে পান , আর তাদের দু‍ঃখ বেদনা যেন তাকে আরও ব্যথিত করে তোলে।বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত, দুঃস্থ মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের কখনো আংশিক কখনো সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে শুরু করেন।একে একে তৈরি করেন বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।অর্থ দিয়ে সহায়তা করে মুর্শিদাবাদের নবগ্রামে তৈরি করান একটি কলেজ, সেখানকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কলেজটির নামকরন করেন 'নবগ্রাম অমরচাঁদ কুণ্ডু কলেজ'।আর‌ও বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে চলেছে আগামীতে। এছাড়াও আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন মেটাতে এতটুকু কার্পন্য করতে তাঁকে দেখা যায় না।আর একটা কথা প্রায়ই বলতে শোনা যায় অমরচাঁদ কুণ্ডুকে,'সমাজসেবার সব থেকে মহান ক্ষেত্র শিক্ষাক্ষেত্র। একটা ছেলেকে প্রকৃত শিক্ষা পেতে সহায়তা করলে একটি পরিবারের উপকারের পাশাপাশি সমাজ উপকৃত হবে।' তাইতো তিনি বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয় করেন বহু অর্থ। প্রত্যেক বছর আনুষ্ঠানিকভাবে শত শত ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দেন আর্থিক সহায়তা থেকে শিক্ষা সামগ্রী। এছাড়াও কয়েকশো দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে পড়াশোনার খরচ যুগিয়ে চলেছেন তিনি,তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ যে আগামীতে স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজের কাজ করে যাবেন তা বলাই বাহুল্য। শুধু শিক্ষা বা ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কাজ করতে আগ্রহী তিনি, ইতিমধ্যে বেশ কিছু সামাজিক সংগঠনের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার সহ অন্যান্য জরুরী পরিষেবার কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী। বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের তিনি নিজ খরচে ডাক্তারী পড়াচ্ছেন,আর সেই সমস্ত ভাবী ডাক্তারদের কাছে শুধু এইটুকু চেয়েছেন যে প্রতিষ্ঠিত হ‌ওয়ার পর তারা যেন কিছুটা সময় সমাজের দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসার জন্য দেয়। এমনকি তাদের সহযোগিতা পেলে তিনি নিজ খরচে হাসপাতাল তৈরি করতেও পিছপা হবেননা বলেও জানান।


        একজন মানুষ নিজের উপার্জনের অর্থ যখন অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারেন তখন তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা যে কতটা সদর্থক হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।তাই সামাজিক কাজে তার উত্তরসূরিরাও যে এগিয়ে যাবে সে ব্যাপারে আশাবাদী তিনিও। তবুও সমাজসেবার জন্য একটি ট্রাস্ট তৈরি করেছেন তিনি,যা আগামীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে যাবে। বিশেষতঃ অর্থের অভাবে দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করতেই তিনি চান। একজন উদ্যোগপতি যখন ব্যবসা,শিল্পের প্রসার ঘটানোর কাজেই মগ্ন থাকতে পছন্দ করেন, উপার্জনের পাশাপাশি আরও বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাই শ্রেয় বলে মনে করে, সেখানে দাঁড়িয়ে অমরচাঁদ কুণ্ডু গরীব,দুঃখী,আর্তের সেবায় নিয়োজিত রাখতে পছন্দ করেন যিনি সমাজ থেকে মেধা অন্বেষণ করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প করেছেন, মনের মধ্যে সেই আশাটা জিইয়ে রেখে যে,তার সহযোগিতায় তৈরী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,আমলারা সমাজ মেরামত করবে, তখন একজন সফল ব্যবসায়ী বা উদ্যোগপতির সমাজসেবা করার আকাঙ্ক্ষাটাই প্রকট হয়ে ওঠে, যা অমরচাঁদ কুণ্ডুকে প্রকৃত সমাজবন্ধুতে পরিণত করেছে।





দেবাশিস পাল

নানুর***বীরভূম

7980435654/9832237959

paldebashis20@gmail.com





                    



Comments

Popular Posts