মোহময়ী মায়াপুরের মায়া ও প্রাচীন বল্লালঢিবিতে নিদ্রামগ্ন ইতিহাসের হাতছানি

অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল একবার সময়মতো  মায়াপুর থেকে ঘুরে আসবো, সেইমতো  কয়েকজন সহকর্মী বন্ধুকে নিয়ে ঠিক করলাম আগামী সপ্তাহেই  মায়াপুর থেকে ঘুরে আসা যাক। মায়াপুর ইস্কন মন্দিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান লেগেই থাকে বারোমাস,আর বছরের বিভিন্ন সময়ে, সেখানে হাজির হয় দেশ-বিদেশের লাখো লাখো ভক্ত ও পর্যটক। আমার আবার  অনুষ্ঠানের প্রতি অতোটা আকর্ষণ না থাকলেও মায়াপুরের গঙ্গার তীরবর্তী ইস্কনের নির্মিয়মান চন্দ্রোদয় মন্দির যা  আগামী আরও কয়েক বছর লাগবে সম্পূর্ণ করতে, এবং সেটিই হবে বিশ্বের সবথেকে বড় মন্দির আর বল্লাল সেনের ঢিবি দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল বহু দিনের। সেইমতো সম্মতি দিলাম।

মায়াপুরের পথে:-

দিনটি ছিল রবিবার, কীর্ণাহার থেকে সকাল আটটায় আমরা  আটজন মিলে গাড়ি নিয়ে রওনা  হলাম, সঙ্গে ভাতৃসম পলাশ, সুকান্ত,সুমন, বাল্যবন্ধু সুব্রত  আর তাপসদা,রথীনদা ও আমাদের সকলের অভিভাবক সম নীলাচল দাস। গাড়ি ছুটছে সিউড়ি-কাটোয়া রাজ্য সড়ক ধরে। এতদিন পর্যন্ত এ রাস্তায় আমার যাওয়া আসার দৌড় কাটোয়া পর্যন্ত। এবার সে গণ্ডি পেরিয়ে চললাম নদীয়া জেলার মায়াপুর এর পথে।রাস্তার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, তাই গাড়িতে বসে থাকতে বিরক্তি বোধ হচ্ছিল তবুও কিছুটা  এবরো-খেবরো রাস্তার উপর দিয়েই ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি।মাঝে একবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে চা বিস্কুট খাওয়া আর তারপরে আবার যাত্রা শুরু। এক সময় পৌঁছে গেলাম নবদ্বীপ, কিন্তু এবারের গন্তব্য নবদ্বীপ নয় তাই এগিয়ে চললো আমাদের গাড়ি। সামনে গৌরাঙ্গ সেতু, মাত্র কিছু দিন আগেই এই সেতুর‌ই গৌরাঙ্গ মুর্তিটির ছবি বেরিয়েছিল খবরের কাগজে। যে ছবিতে মহাপ্রভুর কাঁধে ছিল দুটি হনুমান। আজ হনুমান দুটি না থাকলেও মহাপ্রভু কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে ঠিক একইরকম ভাবে। একটু এগিয়েই বাঁ দিকে তাকাতেই দূরে নজর পড়ল ইস্কনের বিশাল আকারের নির্মিয়মান চন্দ্রোদয় মন্দির। দেখলাম জলঙ্গী নদীকে। নবদ্বীপ থেকে গঙ্গা পেরিয়েই মায়াপুর, কিন্তু সড়ক পথে যেতে গেলে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হবে। সেইমতো জাতীয় সড়কে যেতে শুরু করলাম কিছুটা অসাবধানতায় মায়াপুর যাওয়ার রাস্তা পেরিয়ে  চলে গিয়েছিলাম প্রায় আট কিলোমিটার, ভুল ভাঙতে আবার ঘুরে এসে ধরলাম মায়াপুরে রাস্তা।শেষ পর্যন্ত ইস্কন মন্দিরের গেটের সামনে পৌঁছালাম তখন প্রায় দুপুর বারোটা। অনুমতি নিয়ে গাড়ি ভেতরে ঢুকিয়ে গাড়ি রাখা জায়গায় গাড়ি রাখলাম।

ইসকন মন্দিরে:-

নীলাচল বাবু আগে থেকেই থাকার জন্য ঘর বুকিং করে রেখেছিলেন ইস্কনের 'শ্রুতি ভবনে'। সেখানে একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর আমরা সকলে মিলে চলে গেলাম শ্রীল প্রভুপাদের পুষ্পসমাধি মন্দিরের পাশে সেখানে দুপুরের প্রসাদ গ্রহণের পর ইতস্তত এদিক ওদিক কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি।সামনেই নির্মীয়মান সুবিশাল মন্দির যা আগামীতে স্থান করে নিতে চলেছে বিশ্বের বৃহত্তম মন্দির হিসেব। সারাটা বিকেল সকলে মিলে ঘুরলাম দেখলাম শঙ্খ,চক্র,গদা,পদ্ম গীতা ভবন সহ বিভিন্ন ভবন, সুবিশাল এলাকার বিভিন্ন স্থানে এখনো নির্মাণ কাজ চলছে।
ঘুরলাম অখন্ড হরিনাম সংকীর্তনের ভজন কুঠির, বৈদিক তারামন্ডল। সন্ধ্যায় ইস্কনের চন্দ্রোদয় মন্দির দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যটকদের উপস্থিতি সন্ধ্যারতি ছিল দেখার মতো। মন্দিরের মূল আকর্ষণ রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ, পাশেই রয়েছে গৌর-নিতাই সহ অন্যান্য সখাদের মূর্তি, ভগবান নৃসিংহদেবের এক অপূর্ব মুর্তি ও আর‌ও অন্যান্য বিগ্রহ। সেদিনের মত ঘরে ফিরলাম সারারাত বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে আমরা কয়েকজন বের হলাম শ্রুতি ভবন থেকে কিছুটা দূরেই গোশালায় সেখানে বেশ কিছু বিদেশী কে দেখতে পেলাম নির্দ্বিধায় গোশালা পরিষ্কার করছে। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গরু। শ্যামলী, ধবলী ইত্যাদি নাম দেওয়া গরুগুলোও ছিল আকর্ষণীয়। গোশালার চত্বরেই রয়েছে এখানকার উৎপাদিত বিভিন্ন দ্রব্যের বিক্রয়ের ব্যবস্থা। ওখান থেকে বেরিয়ে ইস্কন মেন গেটের পাশে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছি এমন সময় এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা এসে সকলের কপালে এঁকে দিলেন তিলক প্রত্যেকেই কিছু সাহায্য করল। আর আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনার বাড়ি কোথায়? বললেন বাড়ি নবদ্বীপ  এক ছেলে ও মেয়ে মেয়ে ছিল।মেয়েটা হঠাৎ মারা গেছে আর ছেলেও দায়িত্ব নেয় না মায়ের, আর তাই বাধ্য হয়ে পঁচাশি বছর বয়সেও বিমলা দাসী প্রত্যহ নদী পেরিয়ে মায়াপুর আসতে বাধ্য হয়।ভক্তদের কপালে তিলক এঁকে, তাদের দেওয়া সামান্য অর্থ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন বিমলা দাসী।

মায়াপুরের মঠে ও পথে :-

 আমরা সকলে মিলে ঠিক করলাম একটা টোটো বা অটো ঠিক করা যাক,আর সেটা নিয়ে ঘুরে ফেলা যাক সমগ্র মায়াপুর। আমার লক্ষ্য ছিল কিন্তু সেই বল্লাল ঢিবি যাই হোক দুইশত টাকায় টোটো ঠিক করে আমরা বের হলাম গ্রাম ঘুরতে  গৌড়ীয় মঠ, চৈতন্য মঠ,ক্ষেত্রপাল শিব মন্দির, শ্রীবাস অঙ্গন, অদ্বৈত্বাচার্যের গৃহ সহ অন্যান্য চৈতন্য পার্ষদদের তথাকথিত আবাসস্থল ও গৌরাঙ্গের জন্মস্থান ঘুরলাম।অজস্র মঠ-মন্দির এই মায়াপুরে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে হলে কয়েকটা দিন লেগে যাবে।


চাঁদ কাজীর সমাধি:

সব ঘুরে আমরা গেলাম মায়াপুর থেকে চার কিলোমিটার দূরে বামুনপুকুর সেখানে চাঁদ কাজীর সমাধিস্থল অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কথিত আছে মহাপ্রভুর সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে বিরোধ থাকলেও পরবর্তীকালে চাঁদ কাজী গৌরাঙ্গের অন্যতম ভক্তে পরিণত হন। আর তার মৃত্যুর পর সমাধির উপরে গৌরাঙ্গ নিজ হাতে একটি  চাঁপা গাছ রোপণ করেন। বিশাল আকার চাঁপা গাছ এখনো সেখানে বিদ্যমান তার নিম্নে বসে যেমন হিন্দু-ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয় তেমন‌ই থাকেন মুসলমান ফকিরেরাও,উভয় ধর্মের মানুষের আনাগোনা এখানে। স্থানকে কেন্দ্র করে হিন্দুরা যেমন আসেন  ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।ঠিক তেমনই মুসলমানেরাও আসেন চাদর চড়ান প্রার্থনা করেন। ভক্তরা এখানে যারা আসেন তারা সমাধিস্থল কে প্রদক্ষিণ করতে ভোলেন না। হিন্দু-মুসলিমের এক আশ্চর্য মিলনক্ষেত্র যা মুগ্ধ করে সকলকেই।তাই চাঁদ কাজীর সমাধি স্থল দর্শন না করলে মায়াপুর ভ্রমণ অপূর্ণই রয়ে যায়।

বল্লাল ঢিবি:-

চাঁদ কাজীর সমাধি স্থল থেকে বেরিয়ে গ্রাম্য রাস্তায় কিছুটা যাওয়ার পর‌ বামুনপুকুরেই সেই স্থান। বাংলার সেনবংশের স্মৃতিবিজড়িত বল্লাল ঢিবি, ধীরে ধীরে উঠলাম কুড়ি পঁচিশ ফুট উঁচু এই ধ্বংসস্তূপে, চারদিকে অজস্র পোড়া ইটের কাঠামো।গত শতাব্দীর আটের দশকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে খননকার্য চালানো হয়েছিল এখানে, বিভিন্ন পোড়ামাটির মানুষ ও জীবজন্তুর  মূর্তি, তামার বাসন পত্র, লোহার তৈরি ও নানান প্রত্নসামগ্রী এখানে পাওয়া যায়। সমস্ত নিদর্শন ঐবিভাগের অধীনে সুরক্ষিত আছে বলেই জানা যায়।তবে এই ধ্বংসাবশেষ টি সম্পূর্ণ পোড়ামাটির ইঁট দ্বারা নির্মিত,আর মাঝে দেখতে পাওয়া গেল কুমিরের মাথার আকৃতি এক মুর্তি যা দেওয়ালের সঙ্গে গাঁথা আছে এটি বিশেষ কোন কাজে ব্যবহার করা হতো বলেই মনে হয়।  সুকান্ত হঠাৎ একটা ইঁট দেখিয়ে বললো, 'দাদা তুমি বলছিলে যে এটি অনেক পুরানো, কিন্তু এই দেখো এই ইঁটের উপর  ইংরেজিতে লেখাটি বোধহয়   কোম্পানির নাম। বোঝালাম এটি আসলে বহুবার সংস্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে আর এই গুলি সেই সংস্কারের‌ই চিহ্ন। অনেকেই একে সুবিশাল মন্দির বলে মনে করেন এবং তার স্বপক্ষে যুক্তি দেখান যে এই ধ্বংসস্তূপের পাঁচটি প্রান্ত লক্ষ্য যায় অর্থাৎ একসময় পঞ্চরত্ন শৈলীতে এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল যা পরবর্তীকালে বন্যা বা ভূমিকম্প জাতীয় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরাতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড থেকেও জানা গেল,এটি অষ্টম ও নবম শতকে ধ্বংস প্রাপ্ত পুরাতন স্থাপত্য কীর্তির উপর নতুন করে নির্মাণ কাজ চালানো হয় এবং খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে এটি একটি বিশাল মন্দিরের রূপ ধারণ করে। এর সম্মুখেই ছিল এক সুবিশাল দিঘী যা নাকি বল্লাল দিঘী  নামে পরিচিত ছিল। সেখানে স্নান  করতেন রাজ পরিবারের নর-নারীরা।স্বপ্ন পূরণ হলো, চুপচাপ বসে রইলাম কিছুক্ষণ একটা পাঁচিলের পাশে, চোখ বুজে বসে থাকতেই যেন কানের মধ্যে শুনতে পাচ্ছিলাম মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনি আর রাজপুরুষদের পদধ্বনি।

আবার ইস্কনে:-

 ফিরে এলাম নিজেদের থাকার স্থানে। কিছুক্ষণ পরে ঠিক করলাম গঙ্গা স্নানে যাব। তাই সকলে মিলে বের হলাম গঙ্গার উদ্দেশ্যে এবার আর কোন টোটো গাড়ি নয় শ্রুতি ভবন থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে পৌছালাম গঙ্গার ঘাট। গঙ্গার ঘাটে ও তখন প্রচুর জনসমাগম হই হট্টগোল হাজার হাজার পূর্ণার্থী স্নান করছে।কেউ কেউ আবা অধিক পুণ্য লোভে পুরোহিতের স্থাপন করা গোপালকে স্নান করাচ্ছেন। স্নান সেরে ফিরে এলাম, দুপুরের আহারের জন্য নীলাচলবাবু ব্যবস্থা করেছিলেন  গদা ভবনে। সুন্দর নিরামিষ আহার সেরে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম। সন্ধ্যায় চন্দ্রোদয় মন্দিরে  বিশেষ অনুষ্ঠান। লাখো ভক্তের সমাগম।আমরাও যোগ দিলাম সেই অনুষ্ঠানে।খোল করতাল সহযোগে  নাম সংকীর্তন ও তার তালে তালে ভক্তদের নৃত্য সে এক মনোজ্ঞ পরিবেশের সৃষ্টি করে।

      ভোর হতেই রওনা হলাম শ্রীধাম মায়াপুর থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে। নবদ্বীপ যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও এ যাত্রা কোন উপায় নেই সকলকে ফিরতে হবে নিজে নিজের কাজে তাই  আবার সড়ক পথে ফিরে চললাম আমাদের নিজের নিজের বাসস্থানের উদ্দেশ্যে।


*কোলকাতা থেকে সরাসরি কিছু বাস মায়াপুর যায় এছাড়াও নবদ্বীপ পর্যন্ত বাস বা ট্রেনে গিয়ে গঙ্গা পার হয়েও যাওয়া যায়।

**থাকার জন্য ইস্কনের বিভিন্ন ভবন আছে,তবে আগে থেকে বুকিং করে যাওয়াই ভালো।
এছাড়াও অজস্র গেস্ট হাউস রয়েছে।

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত

দেবাশিস পাল
নানুর

Comments

Popular Posts