কুমারসম্ভবের কবি ও বেলুটীর সরস্বতী
খুব ছোটবেলায় আমরা কালিদাসের ধাঁধা খনার বচন প্রভৃতি বইগুলো পড়তাম আর সেইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেখক লেখিকাদের জীবন কাহিনীও শুনতাম বড়দের কাছে। তার মধ্যে কালিদাসের জীবন কাহিনী আকর্ষিত করতো সব থেকে বেশী। মূর্খ কালিদাস থেকে মহাকবি কালিদাসে পরিণত হওয়ার চমকপ্রদ কাহিনী দাগ কেটেছিল সেই বাল্য বয়সেই। এখনো কাউকে বোকামি করা দেখলে আমরা বলে উঠি 'কালিদাসের মত বুদ্ধি!' এরকমই কালিদাস সম্বন্ধে বিভিন্ন গল্প শুনতে পাওয়া যায় ভারতবর্ষের আনাচে কানাচে, যদিও তার জীবন কাহিনী সম্পর্কে সে রকম কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না তবুও লোককথা অনুযায়ী চরম মূর্খ কালিদাস সৌভাগ্যক্রমে এক রাজকুমারীকে স্ত্রী হিসাবে লাভ করেন কিন্তু তার মূর্খতার পরিচয় পেয়ে রাজকুমারী কালিদাস কে প্রচণ্ড অপমান করেন। অপমানিত কালিদাস প্রাণ বিসর্জনের জন্য এক সরোবরে যান। কিন্তু দেবী সরস্বতী কালিদাসকে প্রাণ বিসর্জন থেকে বিরত করেন। দেবীর কৃপাদৃষ্টিতে কালিদাস হয়ে যান এক মহাপন্ডিত,এমনকি তাঁর পান্ডিত্যের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি কিংবদন্তির রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভার পন্ডিতদের মধ্যে স্থান করে নেন এবং তিনি বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের অন্যতমও হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কালিদাস রচনা করেন মেঘদুত, কুমারসম্ভব, রঘুবংশ, প্রভৃতি কাব্য এবং অভিজ্ঞান শকুন্তলম, মালবিকাগ্নিমিত্রম নাটক সহ অজস্র গ্রন্থ। সমগ্র ভারতবর্ষে কালিদাস সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প শুনতে পাওয়া গেলেও তার প্রকৃত জন্মস্থান যে কোথায় তা জানতে পারা যায় না সঠিকভাবে। কেউ কেউ মনে করেন তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন হিমালয়ের কোলে আবার কেউ কেউ মনে করেন উজ্জয়িনী, কলিঙ্গ বা কাশ্মীরে।তবে তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এমন কি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের উপরেও তার প্রভাব অনেকখানি বলে মনে করেন অনেক বিদগ্ধজন। সংস্কৃত ভাষার এই বিখ্যাত কবি কোন সময়ে জন্মেছিলেন সে সম্বন্ধে অনেকেই সন্দিহান আছেন তবে মালবিকাগ্নিমিত্রম নাটক দেখে কেউ কেউ মনে করেন খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে আবার কেউ কেউ বলেন যদি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত কিংবদন্তি রাজা বিক্রমাদিত্য হন তাহলে হয়তো কালিদাসের সময় কাল হতে পারে চতুর্থ শতকের শেষ ভাগ থেকে পঞ্চম শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত তবে অনেকেই মজা করে বলেন কালিদাসের সময়কাল ও জন্মস্থান না জানতে পারার জন্য কালিদাসই সব থেকে বেশি দায়ী, কারণ যিনি এত গ্রন্থ লিখলেন তিনি কেন কোথাও তার নিজের সম্বন্ধে খানিকটা লিখে রাখলেন না।
এবার আসা যাক ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থানের মতো কালিদাসের অন্যতম দাবিদার গ্রাম বীরভূমের বেলুটী ও দেবী সরস্বতীর প্রসঙ্গে। কালিদাস কে আপন করে নেওয়া বীরভূমের এই গ্রামটির নাম শুনে মনে করা হয়, সম্ভবত বেল গাছের জঙ্গল থাকার জন্যই এরূপ নামকরণ হয়েছে।কালিদাসের সঙ্গে বেলুটীর যে একটা সম্পর্ক ছিল সেই দাবির পিছনে আছে, এক সরস্বতী মন্দির, সমগ্র ভারতবর্ষে যা বিরল। এই মন্দিরে পূজা হয় দুবেলা।ঐতিহ্যবাহী এই সরস্বতী মন্দিরে বর্তমানে পূজা করা হয় দেবীমূর্তির ছয়টি খন্ডিত অংশকে। কথিত আছে চরম মুর্তি বিদ্বেষী কালাপাহাড়ের দ্বারা ধ্বংস হয়েছিল মুর্তি ও মন্দির। মন্দির কে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিলেন কালাপাহাড় আর দেবী সরস্বতীর মূর্তিটিকে বেশ কয়েকটি খণ্ডে খণ্ডিত করে নিক্ষেপ করেছিলেন নিকটস্থ সরোবরের জলে। বর্তমানে যেখানে মহাকবি কালিদাস উচ্চ বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে, একসময় সেখানেই ছিল মন্দিরটির ধ্বংসস্তূপ স্থানীয়দের কাছে জানা যায় নানুর চন্ডীদাস ঢিবির মত আকারে অতটা বড় না হলেও মন্দিরটি যে নেহাতই ছোট আকারের ছিল না তা তার ধ্বংসস্তূপ দেখে বুঝতে পারা যেত। আর তা দেউলের ঢিবি বলেই পরিচিত ছিল। বেলুটিবাসীর বিশ্বাস অনুযায়ী, যে সরোবরে প্রাণ বিসর্জন করতে যাওয়া কালিদাস কে রক্ষা করেছিলেন দেবী সরস্বতী সেই সরোবরেই দীর্ঘদিন নিমজ্জিত হয়েছিল দেবীমূর্তির খণ্ডাংশগুলি। প্রায় শতবর্ষ ছুঁইছুঁই বটকৃষ্ণ পান্ডা ও তার সত্তরোর্ধ্ব ভাই শ্যামাচরণ পান্ডা বর্তমানে দেবীর পুজোর দায়িত্ব পালন করছেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করেই। যদিও তাঁদের আদি বাড়ি ছিল নানুরেরই উকরুন্দী গ্রামে, বেলুটী তাঁদের মামারবাড়ী এবং পরবর্তীকালে এখানেই বসবাস শুরু করেন,তাঁরা বলছিলেন সরস্বতী মন্দির নিকটস্থ যে কয়েকটি পুকুর এখন বর্তমান,সব পুকুর পুকুর গুলি একত্রিত হয়েই ছিল সেকালের সুবিশাল সরোবর, তার একটি অংশ এখন সরস্বতী মন্দির এর পিছনে অবস্থান করছে। বহুবছর পূর্বে এই পুকুর থেকেই সরস্বতী মূর্তি উদ্ধার হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে তমালবনে নিমগাছের তলায় পূজিত হওয়ার পর, মন্দির তৈরি করে স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে ভগ্ন মন্দির নতুন করে তৈরি করে দেন স্থানীয় নীলকন্ঠ সাহার শাশুরীমাতা চিত্রবালা দেবী। কিন্তু কালের অমোঘ নিয়মে সেই মন্দিরও একদিন ভগ্নপ্রায় হয়ে গেলে পরবর্তীকালে পুনঃ নির্মাণ করেন শ্যামাচরণ পাণ্ডার ছোট ছেলে সুবীর পান্ডা, যিনি এখন দিল্লিতে উঁচুপদে কর্মরত। বেলুটি এলাকায় বিভিন্ন সময় গুপ্ত যুগের অনেক প্রত্নসামগ্রী ও মুদ্রা পাওয়া গেছে বলে জানা যায় কয়েক বছর আগে স্থানীয় একটি পুকুরে একশো দিনের কাজ করার সময় উদ্ধার হয় একটি মুর্তি।গ্রামবাসীরা পাণ্ডাদের বাড়ির সামনেই নতুন মন্দির তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করেছেন মুর্তিটি। শ্যামাচরণ পান্ডা জানালেন কিছুটা বাংলা ও কিছুটা দেবনাগরীর মতো অক্ষরে মূর্তিটির পিছনে শ্রীমাধব লেখা আছে বলে মনে করা হয়। তাই গুপ্ত সমসাময়িক যুগে যে এই এলাকার সঙ্গে যে কিছু একটা সম্পর্ক আছে তা বলা যেতেই পারে। তাছাড়া দাস যুক্ত নামের প্রচলন বঙ্গদেশেই সব থেকে বেশি,সেদিক দিয়ে জন্ম সুত্রে কালিদাসের সঙ্গে বঙ্গদেশের একটা যোগ আছে বলেই মনে করেন শ্যামাচরনবাবু।
কালিদাসের জন্ম যেখানেই হোক না কেন তার সঙ্গে বেলুটি যে সম্পর্কই থাকুক না কেন বেলুটির সরস্বতী মন্দির যে স্বমহিমায় উজ্জল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না সমগ্র ভারতবর্ষ প্রদক্ষিণ করলে মাত্র কয়েক জায়গায় দেখতে পাওয়া যায় সরস্বতী মন্দির, আর দুবেলা পূজার ব্যবস্থা তা তো একরকম বিরল। সমস্ত গ্রামবাসী ভক্তি সহকারে পূজা করেন এই দেবী সরস্বতীকে। পূজার সময় বেলুটী গ্রামের অন্য কোন মূর্তি পূজা হয় না, এমনকি গ্রামের স্কুলদুটিতেও হয়না বাগদেবীর আরাধনা। সকলে পূজা করেন এই মন্দিরের প্রস্তর মুর্তিকেই। বহুদূর থেকেও প্রচুর ভক্তের আগমন হয় বছর ধরেই। সন্তান-সন্ততিদের মঙ্গল কামনায় দেবীর কাছে প্রার্থনার জন্য আসেন দেশ বিদেশ থেকেও।তাই কোনো প্রামাণ্য তথ্য বা নথি থাকুক বা না থাকুক এখানকার সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বেলুটীর এই সরস্বতীই একসময় কবি কালিদাসের আরাধ্যা ছিলেন।
আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত
আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত
Comments
Post a Comment