ফাইলেরিয়া নির্মূল করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন
ছোটবেলায় বড়রা আমাদের ভয় দেখিয়ে বলতেন কাউকে লাথি মারলে পায়ে গোদ হয়। সেই সময়েই পাশের গ্রামের এক বয়স্কা মহিলাকে, ফুলে যাওয়া পায়ে ভর করে, অত্যন্ত কষ্ট করে চলাফেরা করতেও দেখেছি। তাই গোদ যে একটা ভয়ংকর রোগ তা কিন্তু মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিলো সেই ছোট্ট বয়স থেকেই।গোদেরই আরেক নাম ফাইলেরিয়া।এই রোগ যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা আক্রান্ত মানুষ দেখলেই বোঝা যায়,শরীরের যেকোনো অঙ্গকে বিকৃত করতে পারে এই রোগটি। একটা সুস্থ সাধারণ মানুষ, সামান্য অবহেলায় আক্রান্ত হতে পারে, আর তার পর এর ফল হতে পারে ভয়াবহ। সুস্থ জীবনে ফিরে আসার জন্য তাকে করতে হয় প্রচণ্ড লড়াই। হয়তো সব ক্ষেত্রে লড়াই সফল নাও হতে পারে,তাই স্বাস্থ্য দপ্তর কিন্তু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেই ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকেই, ভয়াবহ রোগটিকে একেবারে নির্মূল করার জন্য।এখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে এই রোগকে কি একেবারে নির্মূল করা সম্ভব,হ্যাঁ একেবারে নির্মূল করা সম্ভব,তবে তার জন্য একটু সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে, আর দেশের আপামর জনসাধারণকে একটু সচেতন করার চেষ্টা চালাতে হবে, তাহলেই আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা আমাদের জেলা-রাজ্য তথা দেশকে ফাইলেরিয়া মুক্ত করতে পারব।এবছর ৮ই জুলাই থেকে শুরু করে ১৩ ই জুলাই পর্যন্ত ছয়দিনব্যাপী স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে এই রোগের প্রতিষেধক ওষুধ খাওয়ানো চলছে সমগ্র জেলা জুড়ে। হাজার হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ও তাদের সহযোদ্ধারা এই কর্মসূচি সফল করবেই।আর এর মূল লক্ষ্য কিন্তু ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ নির্মূল করা।
আমাদের মত গ্রীষ্ম প্রধান দেশে বহু রোগের বাহক মশা। এই রোগটিরও অন্যতম বাহক সে। বিশেষজ্ঞদের মতে মূলত কিউলেক্স প্রজাতির মশা এই রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে। যখন কোন আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত পান করে তখন তার রক্তের সাথে কিছু পরজীবী মশার শরীরে চলে যায় এবং তা মশার শরীরে পরিণত হয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় এবং দশ-বারো দিনের মধ্যে আক্রমণ করার ক্ষমতা লাভ করে।পরবর্তীকালে যখন কোন সুস্থ মানুষকে মশাটি কামড়ায় তখন সুস্থ মানুষটি ফাইলেরিয়া পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়।এরপর ধীরে ধীরে পরজীবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে, বা বলা যায় এই রোগ হয় এক ধরনের কৃমি থেকে। পূর্ণবয়স্ক কৃমি আক্রান্ত ব্যক্তির লসিকাগ্রন্থির মধ্যে বাস করে। স্ত্রী কৃমি প্রচুর প্রজনন ঘটায়। বাচ্চা কৃমি বা মাইক্রোফাইলেরিয়া রক্তের মধ্যে চলে আসে এবং রক্তনালীর মধ্য দিয়ে প্রধানতঃ রাতের দিকে, রক্ত স্রোতের সাথে ভেসে বেড়ায়।আর যেহেতু এই রোগের জীবাণু রাত্রিবেলা বেশি সক্রিয় হয় তাই মাঝেমধ্যেই স্বাস্থ্য দপ্তর রাত্রিকালীন রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করে এ রোগের জীবাণু অধ্যুষিত এলাকা খুঁজে বের করার জন্য।প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সে রকম কোন উপসর্গ দেখা না গেলেও, চূড়ান্ত অবস্থায় জ্বর, কাঁপুনি সহ বিভিন্ন অঙ্গ ফুলে যাওয়া ও অন্ডকোষে জল জমার মতো বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়।এই রোগের ক্ষেত্রে যন্ত্রণা নিরোধক ঔষধ এবং রক্তে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য কিছু ঔষধ ব্যবহার করা হয়, যা পরজীবীর লার্ভাগুলিকে মেরে ফেলে এবং প্রাপ্তবয়স্ক পরজীবীর বৃদ্ধি আটকায় তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগের রোগীদের অস্ত্রোপচার টেবিলে যেতেই হয়।
পশ্চিমবঙ্গে যে কয়েকটি জেলা ফাইলেরিয়া অধ্যুষিত তার মধ্যে অন্যতম আমাদের জেলা বীরভূম।আমাদের জেলাতে বহু মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন অঙ্গের কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এই শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই প্রত্যেক বছর গণ ঔষধ সেবন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সাধারণ মানুষ অনেকেই এই ঔষধ ঠিকঠাক খেতে দ্বিধা বোধ করেন, অনেকে এর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন আবার কেউ কেউ মনে করেন, 'আমাদের তো হয়নি তো কেন খাব?'আবার অনেকে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ভয়ে খান না। এ সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলতে হয় দুর্ঘটনা ঘটার আগে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত নয় কি?' ফাইলেরিয়ার জীবাণু প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, বেশ কয়েক বছর ধরে তার প্রতিক্রিয়া বোঝা যায় না, এর মধ্যে তারা পরিপূর্ণ রূপ নেয় এবং সংখ্যা বাড়িয়ে চলে তাই বাইরে থেকে সুস্থ স্বাভাবিক মনে হলেও তার ভিতরে যে জীবাণু নেই তা কে বলতে পারে?সে ক্ষেত্রে সকলে একই সঙ্গে যদি প্রতিষেধক ঔষধ খেয়ে নেয় তাহলে অপরিণত পরজীবী ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বংশ বিস্তারের কোনো সুযোগ থাকবে না এবং পূর্ণবয়স্ক পরজীবী গুলিও তাদের বংশবিস্তারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় পরবর্তীকালে আর ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে না।আর হ্যাঁ এই ওষুধ খেলে সে রকম কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, ওষুধ গুলো যথেষ্ট নিরাপদ প্রত্যেক বছরে অসংখ্য মানুষ এই ওষুধ খান, তার মধ্যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সে রকম দেখা যায় না বললেই চলে। মূলত কিছু কিছু ক্ষেত্রে যাদের শরীরে এই জীবাণু বাসা বেঁধেছিল ঔষধ খাওয়ার ফলে যখন জীবাণু ধ্বংস হয় তখন সামান্য মাথা-শরীর ব্যথা বা অল্প-স্বল্প জ্বর দেখা যেতে পারে। তবে সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে এই সামান্য লক্ষনগুলো ঔষধের কার্যকারীতার লক্ষণ বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আর মানসিক দুর্বলতার জন্যও অনেক সময় মাথা ব্যথা শরীর ব্যথা হচ্ছে বলে মনে হয়।তবে দুই বছরের কম বয়সী শিশু গর্ভবতী মা এবং গুরুতর অসুস্থ থাকলে এই ঔষধ খাওয়া উচিত নয়। সামান্য অসুস্থতার জন্য কিন্তু এই ওষুধ বাদ দেওয়া উচিত নয়, সেক্ষেত্রে আসল উদ্দেশ্য কখনোই সফল হবে না।
বীরভূম জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে জানতে পারলাম বিগত বছরে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৮.১৯ শতাংশ মানুষকে এই ঔষধ খাওয়ানো হয়েছিল, আর এই রোগের চিকিৎসার জন্য ‘মাস ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা ‘এমডিএ’ কর্মসূচির মাধ্যমে সকলে একই দিনে ডায়াথিল কারবামাজাইন বা ডিইসি এবং অ্যালবেন্ডাজোল এই দুই ধরনের ওষুধ স্বাস্থ্য কর্মীদের নির্দেশ মত নির্দিষ্ট পরিমাণে খেলে তবেই ওই এলাকায় ফাইলেরিয়া রোগ ছড়ানো বন্ধ হবে ও এই রোগ থেকে মুক্ত হবে। সবশেষে একটা কথা জানিয়ে রাখি,এর আগেও প্রতিষেধক ব্যবহার করে ভারতবর্ষের বুক থেকে নানান ভয়ঙ্কর রোগ কে আমরা নির্মূল করতে পেরেছি, আমরা সদ্য নির্মূল করেছি পোলিওর মতো রোগকেও। তাই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা ফাইলেরিয়াকে ভারত ছাড়া করবো, আসুন সকলে মিলে এই অঙ্গীকার করি।
Comments
Post a Comment