ভাঙন ধরা নদীকূলে মুছে যেতে বসা গ্রাম পারআবাদের কথা
'বাড়ি আমার ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে,
জল যেখানে সোহাগ-ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।
- কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের জন্মভূমিকে নিয়ে লেখা 'আমার বাড়ি' কবিতাটি ও বিশেষ করে কবিতার উপরের লাইনদুটি ঠাঁই করে নিয়েছে লক্ষ বাঙালি হৃদয় পটে। কিন্তু এরকমই কতশত গ্রাম রয়ে গেছে আমাদের এই বঙ্গদেশে তার খোঁজ আর ক-জন রাখে? প্রকৃতির নির্জন কোলে নদীর বুকে অযত্নে লালিত সেই গ্রামগুলি হয়তো শেষ হয়ে যাবে একদিন আর তার জন্য দায়ী থাকবে আমাদের উদাসীনতা। সেরকমই এক হারিয়ে যেতে চলা গ্রামের খোঁজে সেদিন পা বাড়ালাম। কীর্ণাহার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে 'মুখার্জী ভবন' অর্থাৎ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মাননীয় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পৈত্রিক ভবন। সেখান থেকে কিছুটা গিয়েই ব্রাহ্মণপাড়া, আর ব্রাহ্মণপাড়ার ভিতর দিয়েই একটি গ্রাম্য রাস্তা সোজা চলে গেছে কুঁয়ে নদীর ধার বরাবর। সেই রাস্তা ধরেই প্রায় দেড় কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখা মিলল এক অর্ধমৃত গ্রামের নাম পারআবাদ। বীরভূম জেলার লাভপুর ব্লকের অন্তর্গত ইন্দাস গ্রাম পঞ্চায়েতের এই গ্রামটিকে তিন দিক ঘিরে আছে কুঁয়ে নদী,আর এই নদীর জন্যই এক অপূর্ব মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে গ্রামটিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একসময় অজস্র চাষযোগ্য জমি, খেলার মাঠ সবকিছু থাকলেও আজ সেই নদীর কারনেই সবকিছু থেকেও না-থাকা। একসময়ের ষাট-সত্তরটি পরিবারের মধ্যে অধিকাংশই চলে গেছে গ্রাম ছেড়ে, অবশিষ্ট মাত্র আটটি পরিবার।সব খুইয়ে অল্প যে কয়েকজন এই গ্রামে বসবাস করছেন তারা প্রত্যেকেই জীবিকার জন্য পার্শ্ববর্তী গ্রামের ক্ষেতের কাজে যান অথবা অন্যান্য কাজ করে দুবেলা দুমুঠো খাবারের বন্দোবস্ত করেন। অল্প যে জমিজমা অবশিষ্ট আছে প্রত্যেক বছর তা চাষ যোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়ে ওঠে না তাদের পক্ষে। জমেছে আগাছা, জমি হারিয়েছে তার চাষ যোগ্যতা। চারদিকে ঘুরে দেখলাম গ্রামটির ধ্বংসাবশেষ, ভেঙে পড়া মাটির দেওয়াল আর খড়ের তৈরি চালার অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে আছে ইতস্তত।একদিকে দেশের জনঘনত্ব বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত আর অন্যদিকে ধীরে ধীরে শেষ হতে চলেছে আরো একটি গ্রাম।উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে এই গ্রাম থেকে চলে যাওয়া মানুষেরা অধিকাংশই ভিড় করেছে নিকটস্থ মফঃস্বল শহর কীর্ণাহারের উপকণ্ঠে। আর পারআবাদ? সে যেন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। গ্রামবাসীরা জানালেন গ্রামটি সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আটাত্তর সালের বন্যায় তারপর আশি, পঁচাশি এবং দু'হাজার সালের বন্যা গ্রামটিকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। গ্রামের চারদিক ঘুরেও দেখা মিলল না একফোঁটা প্রকৃত উন্নয়নের, যদিও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামে বিদ্যুৎ ও টেলিভিশনের কেবল কানেকশন এসেছে, কিন্তু তা-তো নেহাতই বিনোদনের সামগ্রী, মন ভরলেও পেট ভরেনা। নেই কোন সরকারি স্কুল বন্যা থেকে রক্ষা পাবার কোন ব্যবস্থা এমনকি নেই শিশু শিক্ষা কেন্দ্রও। গ্রামবাসীদের রেশন আনতে যেতে হয় প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে লোহাড্ডা গ্রামে। গ্রামের বাচ্চাদের পড়াশোনা করতে যেতে হয় গোকুলবাটি নামক পাশের গ্রামে। এমনকি বিগত 'ফনী' ঝড়ে গোটা দেশ যখন সতর্ক, মাটির ঘরে বসবাসকারী মানুষেরা ঠাঁই নিয়েছিলো স্কুল-ক্লাব সহ বিভিন্ন কংক্রিটের ভবনে, তখন এই গ্রামের অধিবাসীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল তাদের নিজস্ব ছিটেবেড়ার ঘর কারন, তো কংক্রিটের কোনো নিরাপদ স্থান গোটা গ্রামের মধ্যে কোথাও নেই।
বর্তমানে গ্রামের নেই কোন পূজা, নেই কোন উৎসব কেমন যেন থমথমে পরিবেশ।গ্রামের মানুষেরা সব সময় যেন আতঙ্কে ভুগছে, কবে তাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে এই পূর্বপুরুষের ভিটা। একসময় দু-দুটো দুর্গাপূজা ছিল গ্রামে কিন্তু বর্তমানে একটিও নেই, দাঁড়িয়ে আছে দুর্গা মন্দিরগুলি, কিন্তু পুজো চলে গেছে অন্যত্র।পূজার সময়ে রাস্তা ঘাট দুর্গম হওয়ার জন্য এই গ্রামে সহজে আসতে চায় না কেউই, আর ইচ্ছে থাকলেও দুর্গাপূজা করাটা যথেষ্ট ব্যয় সাধ্যও বটে।নবম শ্রেণীতে পড়া ছাত্র অতীন মন্ডল সেও ভুগছে সঙ্গী হীনতায় আফসোস করে বলল, 'সরস্বতী পুজো করবো তারও উপায় নেই, সঙ্গী সাথীও নেই ।' তবে গ্রামের মহিলারা কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছে এক প্রাচীন নিম গাছের তলায় মনসা পূজোর স্থানটি। গ্রাম বাংলার লোকে বলে কাঁচা দেবতা। কিছুটা ভয় ও ভক্তিতে। কাঁচা দেবতা বা দেবীর পূজা তারা করে নিয়ম মত।
একদিন সব ছিল এই গ্রামে,গ্রামের সব থেকে বয়স্ক ব্যক্তি প্রায় বছর পঁচাশির সুকুমার মন্ডল, তিনি জানালেন সেদিনের সেই গৌরবোজ্জল দিনের কথা। বসতো যাত্রাগানের আসর, বলে গেলেন 'প্রমীলার সংসার', 'রক্তের রোঁয়া ধান' প্রভৃতি নাটকের সংলাপ। 'বাঙালি' নামের বিখ্যাত যাত্রাপালায় তিনি নবাবের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আর বাইরের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও আসতেন শখের যাত্রা শিল্পীরা। প্রায় গোটা বছরই নদীর তীরে প্রত্যেক দিন সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় হত রিহার্সাল।পারআবাদ গ্রামের যাত্রার দল যাত্রা করতেও যেতো বিভিন্ন গ্রামে। গ্রামের মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না, তারাও মঞ্চস্থ করতেন বিভিন্ন নাটক। ইরাবতী মন্ডল, স্বপ্না মণ্ডল অভিনীত 'বড়দি' নাটকের কথা এখনও মনে আছে অনেকেরই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হতো বাউল। কবিগানও হতো নিয়মিত। পারআবাদের হরিনামের দলের নামডাক ছিল একসময়, কিন্তু আজ তা অতীত।দল ভেঙে যাওয়ার পর মূলগায়েন প্রবীর মণ্ডল গান শিখিয়ে বেড়ান বিভিন্ন গ্রামে তিনিই জানালেন আজ থেকে পঁচিশ বছর আগেও বিশ্বকর্মা পুজো হতো খুব ধুমধাম করে। লাইট,প্যাণ্ডেল আসতো বড়ো শহর থেকে। গোটা গ্রাম যেন মেতে উঠতো সেই পুজোয়। কিন্তু আজ আট ঘরের এই গ্রামটির সামর্থ্য নেই কোন অনুষ্ঠান করার। একসময় গ্রামে ছিল ফুটবল খেলার মাঠ সেই সময়কার মানস ঘোষ, তাপস ঘোষ, সঞ্জয় মন্ডল সেই খেলার মাঠে অনুশীলন করেই দাপিয়ে বেড়িয়েছে বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতায় জয় করেছে অজস্র পুরস্কার, শীল্ড। সেই খেলোয়াড়েরাও গ্রাম ছেড়েছে আর তাদের সঙ্গে চলে গেছে সেদিনের জয় করা সেই পুরস্কার গুলিও।
জল যেখানে সোহাগ-ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।
- কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের জন্মভূমিকে নিয়ে লেখা 'আমার বাড়ি' কবিতাটি ও বিশেষ করে কবিতার উপরের লাইনদুটি ঠাঁই করে নিয়েছে লক্ষ বাঙালি হৃদয় পটে। কিন্তু এরকমই কতশত গ্রাম রয়ে গেছে আমাদের এই বঙ্গদেশে তার খোঁজ আর ক-জন রাখে? প্রকৃতির নির্জন কোলে নদীর বুকে অযত্নে লালিত সেই গ্রামগুলি হয়তো শেষ হয়ে যাবে একদিন আর তার জন্য দায়ী থাকবে আমাদের উদাসীনতা। সেরকমই এক হারিয়ে যেতে চলা গ্রামের খোঁজে সেদিন পা বাড়ালাম। কীর্ণাহার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে 'মুখার্জী ভবন' অর্থাৎ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মাননীয় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পৈত্রিক ভবন। সেখান থেকে কিছুটা গিয়েই ব্রাহ্মণপাড়া, আর ব্রাহ্মণপাড়ার ভিতর দিয়েই একটি গ্রাম্য রাস্তা সোজা চলে গেছে কুঁয়ে নদীর ধার বরাবর। সেই রাস্তা ধরেই প্রায় দেড় কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখা মিলল এক অর্ধমৃত গ্রামের নাম পারআবাদ। বীরভূম জেলার লাভপুর ব্লকের অন্তর্গত ইন্দাস গ্রাম পঞ্চায়েতের এই গ্রামটিকে তিন দিক ঘিরে আছে কুঁয়ে নদী,আর এই নদীর জন্যই এক অপূর্ব মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে গ্রামটিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একসময় অজস্র চাষযোগ্য জমি, খেলার মাঠ সবকিছু থাকলেও আজ সেই নদীর কারনেই সবকিছু থেকেও না-থাকা। একসময়ের ষাট-সত্তরটি পরিবারের মধ্যে অধিকাংশই চলে গেছে গ্রাম ছেড়ে, অবশিষ্ট মাত্র আটটি পরিবার।সব খুইয়ে অল্প যে কয়েকজন এই গ্রামে বসবাস করছেন তারা প্রত্যেকেই জীবিকার জন্য পার্শ্ববর্তী গ্রামের ক্ষেতের কাজে যান অথবা অন্যান্য কাজ করে দুবেলা দুমুঠো খাবারের বন্দোবস্ত করেন। অল্প যে জমিজমা অবশিষ্ট আছে প্রত্যেক বছর তা চাষ যোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়ে ওঠে না তাদের পক্ষে। জমেছে আগাছা, জমি হারিয়েছে তার চাষ যোগ্যতা। চারদিকে ঘুরে দেখলাম গ্রামটির ধ্বংসাবশেষ, ভেঙে পড়া মাটির দেওয়াল আর খড়ের তৈরি চালার অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে আছে ইতস্তত।একদিকে দেশের জনঘনত্ব বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত আর অন্যদিকে ধীরে ধীরে শেষ হতে চলেছে আরো একটি গ্রাম।উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে এই গ্রাম থেকে চলে যাওয়া মানুষেরা অধিকাংশই ভিড় করেছে নিকটস্থ মফঃস্বল শহর কীর্ণাহারের উপকণ্ঠে। আর পারআবাদ? সে যেন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। গ্রামবাসীরা জানালেন গ্রামটি সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আটাত্তর সালের বন্যায় তারপর আশি, পঁচাশি এবং দু'হাজার সালের বন্যা গ্রামটিকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। গ্রামের চারদিক ঘুরেও দেখা মিলল না একফোঁটা প্রকৃত উন্নয়নের, যদিও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামে বিদ্যুৎ ও টেলিভিশনের কেবল কানেকশন এসেছে, কিন্তু তা-তো নেহাতই বিনোদনের সামগ্রী, মন ভরলেও পেট ভরেনা। নেই কোন সরকারি স্কুল বন্যা থেকে রক্ষা পাবার কোন ব্যবস্থা এমনকি নেই শিশু শিক্ষা কেন্দ্রও। গ্রামবাসীদের রেশন আনতে যেতে হয় প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে লোহাড্ডা গ্রামে। গ্রামের বাচ্চাদের পড়াশোনা করতে যেতে হয় গোকুলবাটি নামক পাশের গ্রামে। এমনকি বিগত 'ফনী' ঝড়ে গোটা দেশ যখন সতর্ক, মাটির ঘরে বসবাসকারী মানুষেরা ঠাঁই নিয়েছিলো স্কুল-ক্লাব সহ বিভিন্ন কংক্রিটের ভবনে, তখন এই গ্রামের অধিবাসীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল তাদের নিজস্ব ছিটেবেড়ার ঘর কারন, তো কংক্রিটের কোনো নিরাপদ স্থান গোটা গ্রামের মধ্যে কোথাও নেই।
বর্তমানে গ্রামের নেই কোন পূজা, নেই কোন উৎসব কেমন যেন থমথমে পরিবেশ।গ্রামের মানুষেরা সব সময় যেন আতঙ্কে ভুগছে, কবে তাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে এই পূর্বপুরুষের ভিটা। একসময় দু-দুটো দুর্গাপূজা ছিল গ্রামে কিন্তু বর্তমানে একটিও নেই, দাঁড়িয়ে আছে দুর্গা মন্দিরগুলি, কিন্তু পুজো চলে গেছে অন্যত্র।পূজার সময়ে রাস্তা ঘাট দুর্গম হওয়ার জন্য এই গ্রামে সহজে আসতে চায় না কেউই, আর ইচ্ছে থাকলেও দুর্গাপূজা করাটা যথেষ্ট ব্যয় সাধ্যও বটে।নবম শ্রেণীতে পড়া ছাত্র অতীন মন্ডল সেও ভুগছে সঙ্গী হীনতায় আফসোস করে বলল, 'সরস্বতী পুজো করবো তারও উপায় নেই, সঙ্গী সাথীও নেই ।' তবে গ্রামের মহিলারা কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছে এক প্রাচীন নিম গাছের তলায় মনসা পূজোর স্থানটি। গ্রাম বাংলার লোকে বলে কাঁচা দেবতা। কিছুটা ভয় ও ভক্তিতে। কাঁচা দেবতা বা দেবীর পূজা তারা করে নিয়ম মত।
একদিন সব ছিল এই গ্রামে,গ্রামের সব থেকে বয়স্ক ব্যক্তি প্রায় বছর পঁচাশির সুকুমার মন্ডল, তিনি জানালেন সেদিনের সেই গৌরবোজ্জল দিনের কথা। বসতো যাত্রাগানের আসর, বলে গেলেন 'প্রমীলার সংসার', 'রক্তের রোঁয়া ধান' প্রভৃতি নাটকের সংলাপ। 'বাঙালি' নামের বিখ্যাত যাত্রাপালায় তিনি নবাবের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আর বাইরের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও আসতেন শখের যাত্রা শিল্পীরা। প্রায় গোটা বছরই নদীর তীরে প্রত্যেক দিন সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় হত রিহার্সাল।পারআবাদ গ্রামের যাত্রার দল যাত্রা করতেও যেতো বিভিন্ন গ্রামে। গ্রামের মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না, তারাও মঞ্চস্থ করতেন বিভিন্ন নাটক। ইরাবতী মন্ডল, স্বপ্না মণ্ডল অভিনীত 'বড়দি' নাটকের কথা এখনও মনে আছে অনেকেরই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হতো বাউল। কবিগানও হতো নিয়মিত। পারআবাদের হরিনামের দলের নামডাক ছিল একসময়, কিন্তু আজ তা অতীত।দল ভেঙে যাওয়ার পর মূলগায়েন প্রবীর মণ্ডল গান শিখিয়ে বেড়ান বিভিন্ন গ্রামে তিনিই জানালেন আজ থেকে পঁচিশ বছর আগেও বিশ্বকর্মা পুজো হতো খুব ধুমধাম করে। লাইট,প্যাণ্ডেল আসতো বড়ো শহর থেকে। গোটা গ্রাম যেন মেতে উঠতো সেই পুজোয়। কিন্তু আজ আট ঘরের এই গ্রামটির সামর্থ্য নেই কোন অনুষ্ঠান করার। একসময় গ্রামে ছিল ফুটবল খেলার মাঠ সেই সময়কার মানস ঘোষ, তাপস ঘোষ, সঞ্জয় মন্ডল সেই খেলার মাঠে অনুশীলন করেই দাপিয়ে বেড়িয়েছে বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতায় জয় করেছে অজস্র পুরস্কার, শীল্ড। সেই খেলোয়াড়েরাও গ্রাম ছেড়েছে আর তাদের সঙ্গে চলে গেছে সেদিনের জয় করা সেই পুরস্কার গুলিও।
গ্রামের প্রকৃত অবস্থাটা গিয়ে ধরা পরল বছর পঁয়তাল্লিশের এর সুচিত্রা ঘোষের বাড়িতে, স্বামীর মৃত্যুর পর অসহায় মহিলা কোন রকমে বিয়ে দিয়েছেন দুই মেয়ের। একা ঘর, ছাগল ভেড়া পুষে শাড়ি বুনে দিন গুজরান করেন সুচিত্রা ঘোষ। আক্ষেপ করে বলছিলেন, 'একদিন হয়তো আত্মহত্যাই করতে হবে আমাকে।সবাই চলে গেলেও আমারতো কোনো উপায় নেই ' বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে চারিদিকে যখন সভ্যতার ছোঁয়ায় মানুষের ন্যূনতম প্রত্যাশা পূরণের কথা গর্ব করে ঘোষণা করছি আমরা, ঠিক তখনই সুচিত্রা ঘোষের এই আক্ষেপ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের প্রকৃত অবস্থাটা। সুচিত্রা ঘোষ যেন সমগ্র পারআবাদ গ্রামের প্রতিচ্ছবি, গ্রামবাসীদের সকলের বক্তব্য যেন প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর এই কথায়।অবস্থার পরিবর্তন না হলে তারাও একদিন চলে যেতে বাধ্য হবে এই গ্রাম ছেড়ে। জনবসতিপূর্ণ গ্রামে শুধু খাড়া হয়ে থাকবে মাটির দেওয়াল গুলি, আর কালের নিয়মে তাও একদিন মিলিয়ে যাবে, তৈরি হবে ঘন জঙ্গল।আজ যেখানে জঙ্গল কেটে মানুষ বসবাস শুরু করছে,থাবা বসাতে বাধ্য হয়েছে পশুদের অধিকারে সেখানে এক সুন্দর ছবির মতো গ্রাম হয়তো একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের উদাসীনতায়। অথচ একটু নজর দিলে হয়তো টিকে যেতে পারে এই ছোট্ট গ্রামটি।বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প এসেছে। এসেছে একশো দিনের কাজ, যে প্রকল্পকে কাজে লাগিয়ে গ্রামের চতুর্দিকে বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব। আগাছা আর বালিতে ঢেকে যাওয়া চাষের জমি উদ্ধার করে চাষ যোগ্য করে তোলা যেতে পারে, তৈরি হতে পারে খেলার মাঠ। আর সরকারি উদ্যোগে হয়তো এই ব্যবস্থাও করা যেতে পারে যাতে আগামী দিনে এই গ্রামের শিশুদের যেতে না হয় বাইরে পড়াশোনা করতে, অন্ততপক্ষে বন্যায় আশ্রয় নেওয়ার জন্য একটি আশ্রয় কেন্দ্রও করা যেতে পারে।তাহলে হয়তো প্রচণ্ড বন্যায় গৃহহীন মানুষ গুলোকে ভেঙে পড়া ঘরের চালের উপরে অভুক্ত অবস্থায় বসে থেকে জল কমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। হয়তো সাত ঘর থেকেই আগামী দিনে সত্তর ঘরে পরিণত হবে। পারআবাদ ফিরে পাবে তার পুরানো গৌরব।
Comments
Post a Comment