আনখা মায়ের মেলায় সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয় সকল ধর্মের মানুষ


কৈগড়া পীরতলা, বীরভূম জেলার পূর্বপ্রান্তের একটি প্রসিদ্ধ স্থান।পাশ দিয়ে চলে গেছে বাংলার বিখ্যাত বাদশাহী সড়ক, জনশ্রুতি আছে যে ঐসময় রাস্তার পাশে তৈরি হয় ক্রোশ অন্তর দিঘি ও ডাক অন্তর মসজিদ অর্থাৎ এক মসজিদের আজানের ডাক শোনা যেত অন্য মসজিদ পর্যন্ত। ভাবতেও অবাক লাগে দুই প্রান্তকে এক করা এই রাস্তার পাশে তৈরি সারিবদ্ধ মসজিদ, যেন আবদ্ধ ছিল আজানের ডাকে। তবে বর্তমানেও এই রাস্তাটি  উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের মেলবন্ধন স্থাপনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এদিকে সিউড়ি কাটোয়া রাজ্যসড়কের কীর্ণাহারের পরেই রয়েছে ব্যাঙ্কমোড় সেখান থেকে একটি গ্রামীণ রাস্তা আলিগ্রাম,ফিন্তোড়,বগতোড়,কৈচড়া হয়ে কৈগড়াতে গিয়ে বাদশাহী সড়কে মিলিত হয়েছে। কৈগড়া গ্রামটি জামনা গ্রাম পঞ্চায়েত এবং লাভপুর ব্লকের অন্তর্গত বীরভূম জেলার পূর্ব প্রান্তের শেষ গ্রাম।এলাকাটি বীরভূম মুর্শিদাবাদ এবং অধুনা পূর্ব বর্ধমান এই তিনটি জেলার মানুষদের এক রকম মিলনক্ষেত্র‌ও বলা চলে। একদিকে মুর্শিদাবাদের মারুট মজলিশপুর অন্যদিকে পূর্ব বর্ধমানের মোড়গ্রাম কাঁটাডিহি, এবং আর একদিকে বীরভূমের হাটকালুহা,কৈগড়া।
       এই স্থানের আশেপাশের প্রায় সব গ্রামগুলোতেই হিন্দু মুসলমান দের আশ্চর্য সহাবস্থান  লক্ষ্যনীয়। এখনো পর্যন্ত কোন ঘটনা বা প্ররোচনাই আলোড়িত করতে পারেনি এখানকার মানুষদের, ক্ষুন্ন হয়নি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। তবে এর পিছনে অবশ্যই লুকিয়ে আছে ওই এলাকার সংস্কৃতি, আর ঠিক যে স্থানকে কেন্দ্র করে ওখানকার হিন্দু মুসলমান সহ সকল জাতি  এক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে আছে সে স্থানটি হল হজরত মা আনখা বিবির সমাধি বা কবরস্থান। আসা যাক পূর্ব ইতিহাসে, বর্তমানে 'হযরত আনখা মা স্মৃতি সমিতি'র সম্পাদক মহম্মদ শাহীদুল্লাহ ও সভাপতি মহম্মদ আলাউদ্দিন সাহেব সহ এলাকার কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারা গেল যে এই স্থানে বহু পূর্বে একসময় আসেন এক অপরিচিতা মহিলা, যদিও সময় কাল সম্বন্ধে কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি তবুও অনেকেই আন্দাজ করেন বাদশাহী সড়ক নির্মাণ মুহূর্তেই হয়তো তাঁর আগমন হয়ে থাকবে। মা আনখার এরূপ নামকরণের কারণ জানতে গিয়ে জানা গেল হঠাৎ বা  আনখা আসার জন্য তার নাম হয়ে যায় আনখা মা তার পূর্বপরিচয় সম্বন্ধে জানা যায় না প্রায় কিছুই, তিনি ও বলতে চাননি কিছুই, স্বভাবতই মানুষ সঠিকভাবে জানতে পারে না তার প্রকৃত ধর্ম বা জাতি,  শুধু এটুকু জানা যায় যে  অধূনা পূর্ব বর্ধমানের কালুতকের বিখ্যাত পীর কালু খাঁয়ের শিষ্যা ছিলেন তিনি। ওই এলাকায় তিনি ইতস্তত ঘোরাঘুরি করতেন, যেতেন হিন্দু ও মুসলমান পাড়াতেও, কোন কিছুতেই বাদ বিচার ছিল না তার। কিন্তু সেই সময় বাংলায় ব্রাহ্মণদের কিছুটা আধিপত্য ছিল। সঠিক পূর্ব পরিচয় না জানার জন্য হিন্দু বা মুসলমান কেউই হয়ত প্রথমে তাঁকে আপন করে নেয়নি। কিন্তু এর জন্য তিনি ত্যাগ করেননি ঐ স্থান।আশ্রয়হীনা হয়ে কিছুদিন ঘোরাঘুরির পর গ্রামের বাইরে একটি ছোট গাছের নিচে তার আস্তানা তৈরি করেন দীর্ঘদিন তিনি সেখানে থাকতেন এবং দিবালোকে খাদ্যের সন্ধানে যেতেন নিকটবর্তী গ্রামগুলিতে আস্তে আস্তে তার অলৌকিক ক্ষমতা ও বিভিন্ন কারণে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তার প্রচুর শিষ্য-শিষ্যাও হয়, তারা নিয়মিত আসতে শুরু করেন ওই স্থানে এরপর মা আনখার বার্ধক্য উপস্থিত হলে তিনি বুঝতে পারেন তার চলে যাওয়ার সময় প্রায় আসন্ন। যেদিন তিনি দেহ রাখেন তার আগের দিন রাত্রে তার শিষ্যদের বলে যান, আমি মারা গেলে ঠিক এইখানে যেন আমার সমাধি দেওয়া হয়। যথারীতি তার পরদিন তিনি দেহত্যাগ করেন সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে কবর দেওয়া হয়,বৃক্ষতলে‌। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন হাজার হাজার হিন্দু-মুসলমান। এরপর থেকেই ঐদিন অর্থাৎ ১১ই ফাল্গুন আনখা মায়ের উরস বা তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে উভয় ধর্মের মানুষ একত্রিত হয় প্রতিবছর। উভয় ধর্মের সাথে জড়িয়ে আছে এমন  সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়  বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রত্যেক বছরই আয়োজন করা হয়।আগে অসংগঠিত ভাবে  ভক্তদের উৎসাহে দিনটি পালন করা হলেও আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে তৈরি হয় আনখা মা স্মৃতি রক্ষা কমিটি, বর্তমানে সেই কমিটির তত্ত্বাবধানে পালিত হয় হযরত মা আনখার উরস উৎসব। আর  তখনকার  সেই  বৃক্ষ আজও অমলিন হয়ে ছড়িয়ে রেখেছে তার শাখা প্রশাখা,যেন আনখা মায়ের মতোই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে স্নেহের ছায়ায় আশ্রয় দিয়ে চলেছে সকলকে।
        কথা হচ্ছিল সংলগ্ন গ্রাম হাটকালুহার মহম্মদ শরীফুদ্দিন সাহেবের সাথে তিনি বলছিলেন,  বর্তমানে  ছয়দিনব্যাপী সুবৃহৎ মেলা বসে, 'এই মেলার নামকরণ হয়েছে 'মহামিলন মেলা' হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মের অপূর্ব মেলবন্ধনের এই মেলার  কমিটিও তৈরি হয়েছে আশেপাশের পনের কুড়িটি গ্রামের দুই ধর্মের মানুষদের নিয়ে। দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় শুরু হয় এক মহাপঙক্তিভোজের। এলাকার হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয় সেখানে, থাকে না কোন জাত পাতের ভেদাভেদ। একসাথে বসে পাতায় পাতা ঠেকিয়ে খেতেও এতটুকু দ্বিধাবোধ করে না কেউ। প্রায় পনের-কুড়ি হাজার এলাকাবাসী সামিল হন ঐদিন।' একই সঙ্গে হিন্দুরা যেমন মা আনখার সমাধিতে দেয় বেলপাতা ধূপ বাতি এবং তাঁর উদ্দেশ্যে করেন কীর্তন গান,একই রকম ভাবে মুসলমানরা মায়ের কবরকে কেন্দ্র  প্রার্থনা করেন, করেন ফকিরি গান। অপূর্ব দৃশ্য দেখতে দূর দুরান্তের মানুষ ভিড় জমান। একসাথে সিন্নি নিয়ে আনখা মায়ের স্থানে চাদর‌ও চড়ান সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষজন। নিকটবর্তী গ্রাম কাঁড়ারপাড়ার  সকল অধিবাসীরাই অংশগ্রহণ করেন মা আনখার মহামিলন মেলায়, গ্রামের সুব্রত সরকার বলছিলেন, 'ছয়দিন ধরেই আয়োজন হয়ে থাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, লোকসংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠানের, রায়বেশে, সাঁওতালি অনুষ্ঠান থেকে বাউল-কবিগান‌ও। কোলকাতার যাত্রা যেমন আসর মাতিয়ে তোলে তেমন‌ই বীরভূম-মুর্শিদাবাদের লেটো-পঞ্চরস‌ও আসে হাস্যরস পরিবেশনের জন্য।' মেলাকে কেন্দ্র করে আগমন হয় বহু বিশিষ্টজনদের। তাঁদের সহযোগিতায় মেলা কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মসূচিও বাস্তবায়িত হয়।মেলাতে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসে। সারি সারি জিলিপির দোকান, তেলেভাজা-খাবারের, খেলনার দোকান, বেতের ধামা-কুলো সহ হস্তশিল্পের বিভিন্ন দোকান।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমানে আসতে শুরু করেছে ইলেকট্রিক ইলেকট্রনিক্স দোকান থেকে মোটর বাইকের শোরুম‌ও। প্রতিদিন বিকেলে কেনাকাটা করতে ভিড় জমায় ছেলে বুড়ো সকলেই। নাগরদোলা, ম্যাজিক শো,পুতুল নাচ  সহ বিনোদনের বিভিন্ন তাঁবুতেও আনন্দ ভাগ করে নেয় সকলেই।
        বিশ্ব ভাতৃত্ববোধের প্রেরণা থেকে  হজরত আনখা মায়ের এই উরস উৎসব যেন বিশ্ববাসীকে বার্তা দিতে চেয়েছে, সন্ত্রস্ত সমাজ নয়-চাই শান্ত নির্মল সমাজ।এই পবিত্র পীঠস্থান যেন মানুষকে শেখায় ধর্মের জন্য মানুষ নয় মানুষের জন্য‌ই ধর্ম।



দেবাশিস পাল
(সাহিত্যকর্মী ও পেশায় ভারতীয় জীবন বীমা নিগমের প্রতিনিধি)

Mob-7980435654
email- paldebashis20@gmail.com

Comments

Popular Posts