ভূরভুরি ডাঙা ও এক মহাশ্মশান
বৈষ্ণব পদকর্তা চণ্ডীদাস এর স্মৃতি বিজড়িত নানুর গ্রামের দক্ষিনে বালিগুনি,বন্দর প্রভৃতি গ্রামগুলির নাম শুনলেই মনে হয় সেগুলি একসময় বিকশিত হয়েছিল নদীকে কেন্দ্র করে। অনুমান করা হয় একসময় এদিকেই বহমান ছিল এক পূর্ণগর্ভা নদী। এখানে সেই পুরাতন নদীর খাত এখনও দেখতে পাওয়া যায়, বর্ষার সময় যথেষ্ট বহমান হলেও অন্যান্য সময় শুষ্ক থাকে।এখন সেই নদী খাত কাঁদর রূপেই পরিগণিত হয়। এখানেই আছে প্রাচীন বাসুদেব নগর যা বর্তমানে উচকরন নামে পরিচিত, গ্রামটি ধর্মমঙ্গলের কবি হৃদয়রাম সাউয়ের বাসভূমি ছিল।আর এই এলাকাতেই আছে আরও এক প্রাচীন গ্রাম সেকালের মূলতিন বা বর্তমানের মুইতিন।এই গ্রাম সংলগ্ন চক-মুইতিন নামে এক বিশাল মৌজা আছে, যার প্রায় পুরোটাই জনবসতিহীন।
চক-মুইতিনের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় সমগ্র অংশ বর্তমানে চাষযোগ্য ভূমি, আর এক দিকে অবস্থান করছে এক বিশাল মহাশ্মশান আর এই মহাশ্মশান সংলগ্ন স্থানে রয়েছে এক পুরাতন আশ্রম,নাম ভুরিশ্রবা আশ্রম।স্থানীয়রা বলেন ভূরভুরি ডাঙা।মুইতিন,মাসড়া,পেঞা,গোন্নাসেরান্দী,পুন্দরা,
বন্দর,বালিগুনি,আঙ্গোরা গ্রামগুলি চারিদিকে অবস্থান করলেও, প্রত্যেকটি গ্রামেরই দুরত্ব এখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার। এখনও শিশুরা দুষ্টুমি করলে, ভয় দেখিয়ে মায়েরা বলেন, 'চল তোকে ভূরভুরি ডাঙ্গায় দিয়ে আসব।' আগে এতটাই আতঙ্কের পরিবেশ ছিল যে, দিনে দুপুরে ওই স্থান পেরোতে হলেও দুইবার ভাবতো , আর তার মূলে ছিল অবশ্যই ওই মহাশ্মশান। প্রায় পনের একর জায়গা জুড়ে মহাশ্মশানের বিভিন্ন স্থানে মাটি খুঁড়লে এখনও দেখা মেলে মানুষের হাড়-গোড়।বর্তমানে মহাশ্মশানের একপ্রান্তে খাদ্যদপ্তর নির্মাণ করছে একটি গুদামঘর। আর আশ্রমের দক্ষিণ দিকে তৈরি হয়েছে একটি সরকারি আইটিআই কলেজ।যেগুলি কে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে এলাকাবাসী।তারা স্বপ্ন দেখছে ভুরভুরে ডাঙ্গা ও মহাশ্মশান সংলগ্ন স্থানকে সুন্দর করে সাজানোর। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন এই মহাশ্মশান ছিল এলাকার দরিদ্র মানুষদের মৃতদেহ বিসর্জনর একমাত্র স্থান। আশেপাশে বিশ-ত্রিশটি গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা তাদের নিকটজন বিয়োগ হলে এখানে এসে, হয় দাহ করতো নয়তো শব দেহ মাটি চাপা দিয়ে যেতে বাধ্য হতো। তৎকালীন সময়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাদের বাধ্য করতো এভাবেই প্রিয়জনদের সৎকার করতে।ভুরভুরি ডাঙ্গা ও মহাশ্মশান এর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া দুটি কান্দর অদূরেই মিলিত হয়েছে।আর সে কান্দরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল অসমতল ভূমিরূপ যার খানাখন্দেই মূলত পুঁতে দেওয়া হতো শবদেহগুলি।আর গভীর রাতে সেই শব দেহগুলি দিয়ে পেটের জ্বালা মেটাতো, শবদেহ ভক্ষণকারী পশুপক্ষীরা, আর তাতেই ইতস্তত ছড়িয়ে থাকতো হাড়গোড়, দেহাবশেষ, যা শ্মশান ভূমিকে এক বিভীষিকাময় পরিবেশের রূপ দিয়েছিল।
শ্মশান সংলগ্ন স্থানের ভুরিশ্রবা আশ্রম সাধক ও সাধারণ মানুষের কাছে এক অত্যন্ত পবিত্র স্থান।লোকমত অনুসারে- মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় পান্ডবপক্ষের দ্বারা ছিন্ন হওয়া শিবভক্ত রাজা ভুরিশ্রবার মস্তক পতিত হয় এই স্থানে। শিব শিব ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে ভুরিশ্রবার ছিন্ন মস্তক এখানে পতিত হলে,সৃষ্টি হয় অজস্র প্রস্রবণ। সেই প্রস্রবণ থেকে নিঃসৃত জলধারা ভুরিশ্রবার মস্তক ধৌত করে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন আজও এখানে কান পাতলে শোনা যায় শিব শিব ধ্বনি।আর একসময় এখনে অজস্র প্রস্রবণ থাকলেও, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত কয়েকটি প্রস্রবণ থেকে প্রায়ই জল বের হতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।এখনও ভরা বর্ষায় প্রস্রবণ গুলোর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, আর প্রস্রবণ গুলি কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বেশ কয়েকটি কুন্ডু এখনো বর্তমান।
কথা হচ্ছিল আশ্রমের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কিছু মানুষদের সঙ্গে। সদ্য বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধে, চারদিকে ঘন অন্ধকারের মধ্যে মন্দির প্রাঙ্গণে বসে স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন বর্ষিয়ান ফণীভূষণ ঠাকুর, আজ থেকে প্রায় সত্তর পঁচাত্তর বছর আগে এখানে আসেন সাধক সীতারামদাস, অল্পভাষী সীতারাম বাবা পিতলের বাঁশি বাজাতে বাজাতে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। সঙ্গে থাকত মহিষের শিং দ্বারা নির্মিত আরো একটি শিঙা।' সীতারাম বাবা ছিলেন একজন বৈষ্ণব সাধক, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে একই সময়ে আশ্রমেই থাকতেন বিশ্বনাথ গিরি নামে একজন শাক্ত সাধক, যিনি সম্ভবত বীরভূমেরই ভূমি পুত্র ছিলেন।সাধনা গত জগতে উভয় দুই মেরুর হলেও, দুজনের মধ্যে মিল ছিল প্রচণ্ড, সীতারাম বাবা পূজা শুরু করতেন গঙ্গা জল দিয়ে, আর বিশ্বনাথ গিরি ব্যবহার করতেন কারণ বারি। যদিও বিশ্বনাথ গিরি মাঝেমধ্যেই নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন, ভ্রমণ করতেন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান।যদিও পাকাপাকিভাবে আশ্রমে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না তবুও বিশ্বনাথ গিরিকে কেন্দ্র করেই অনেক কাহিনী আজও ঐ এলাকায় শোনা যায়। কৌতুহলী গ্রামবাসীকে অসময়ে আমশোল খাওয়ানো, অল্প প্রসাদে বহুজনকে পেটভরে সেবা করানোর মতো ঘটনার কাহিনী আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আশ্রমের পশ্চিম প্রান্তে এক বিশাল বৃক্ষ তলে পঞ্চমুন্ডির আসনটি স্থাপন করেছিলেন বিশ্বনাথ গিরি স্বয়ং। নিয়মিত সাধনা করতে ঐ আসনে বসে।
পরবর্তীকালে আশ্রমে আসেন মুনি বাবা ও মুনি মা, ছিলেনও বেশ কিছুদিন।তবে আশ্রমের মুখ্য উৎসব বাসন্তী পূজা কিন্তু শুরু হয় গোবিন্দানন্দ ব্রহ্মচারীর সময়কালে,সে বছর প্রথমে হয়েছিল অন্নপূর্ণা পূজা কিন্তু পরবর্তীকালে নিয়মিত ভাবে আসতে শুরু করে বাসন্তী পূজা। সেরান্দির রমেন্দ্রনাথ গুপ্ত, তমালকৃষ্ণ মন্ডল, মুইতিনের শংকর ঘোষ প্রমূখ ব্যক্তিদের উদ্যোগে ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় শুরু হওয়া বাসন্তী পূজার প্রথম পুরোহিত ছিলেন গোলোকবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ও ফনীভূষন ঠাকুর।কিন্তু গোবিন্দানন্দ ব্রহ্মচারীর পর সেই অর্থে পাকাপাকিভাবে কোন সাধক এখানে ছিলেন না। তবে প্রত্যেক বছর বাসন্তী পূজার সময় পূজা পরিচালনার জন্য আসতেন মারুট আশ্রম থেকে গোবিন্দানন্দ ব্রহ্মচারীর গুরু ভাই ব্রতানন্দ ব্রহ্মচারী। তবে বর্তমানে আশ্রমের দায়িত্বভার নিয়েছেন সিদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী ও তার সহযোগী ধনঞ্জয় পাল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এলাকাবাসী কখনোই পূজা বন্ধ করেনি। বাসন্তী পূজার সময় হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বসে মেলা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অন্যান্য গ্রামীণ মেলা গুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যেতে বসলেও এই মেলা কিন্তু অন্যরকম। এই ফাঁকা মাঠেও বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেমন আসেন, ঠিক তেমনি আশেপাশের গ্রাম সহ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন হাজির হন এই মেলার টানে। ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে একটি ট্রাস্টি বোর্ড মূলত তাদের পরিচালনায় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে এক সুবৃহৎ মন্দিরের। মনে করা হচ্ছে মন্দিরটি সম্পূর্ন হলে,এটি হবে বীরভূমের অন্যতম আকর্ষণ। আশ্রম সংলগ্ন স্থানে একটি ইকো পার্কের প্রস্তাব রেখেছে এলাকাবাসীরা, আগামীতে সেটিও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সব মিলিয়ে আগামী দিনে এই পবিত্রক্ষেত্র সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পাবে এবং এই পবিত্র ভূমি স্পর্শে, নিজেদের ধন্য করতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজির হবেন পূণ্যার্থীরা। এ সম্পর্কে আশাবাদী ভুরিশ্রবা আশ্রম পরিচালন কমিটি থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই।
আনন্দবাজার পত্রিকা
১৩/০৪/১৯
বৈষ্ণব পদকর্তা চণ্ডীদাস এর স্মৃতি বিজড়িত নানুর গ্রামের দক্ষিনে বালিগুনি,বন্দর প্রভৃতি গ্রামগুলির নাম শুনলেই মনে হয় সেগুলি একসময় বিকশিত হয়েছিল নদীকে কেন্দ্র করে। অনুমান করা হয় একসময় এদিকেই বহমান ছিল এক পূর্ণগর্ভা নদী। এখানে সেই পুরাতন নদীর খাত এখনও দেখতে পাওয়া যায়, বর্ষার সময় যথেষ্ট বহমান হলেও অন্যান্য সময় শুষ্ক থাকে।এখন সেই নদী খাত কাঁদর রূপেই পরিগণিত হয়। এখানেই আছে প্রাচীন বাসুদেব নগর যা বর্তমানে উচকরন নামে পরিচিত, গ্রামটি ধর্মমঙ্গলের কবি হৃদয়রাম সাউয়ের বাসভূমি ছিল।আর এই এলাকাতেই আছে আরও এক প্রাচীন গ্রাম সেকালের মূলতিন বা বর্তমানের মুইতিন।এই গ্রাম সংলগ্ন চক-মুইতিন নামে এক বিশাল মৌজা আছে, যার প্রায় পুরোটাই জনবসতিহীন।
চক-মুইতিনের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় সমগ্র অংশ বর্তমানে চাষযোগ্য ভূমি, আর এক দিকে অবস্থান করছে এক বিশাল মহাশ্মশান আর এই মহাশ্মশান সংলগ্ন স্থানে রয়েছে এক পুরাতন আশ্রম,নাম ভুরিশ্রবা আশ্রম।স্থানীয়রা বলেন ভূরভুরি ডাঙা।মুইতিন,মাসড়া,পেঞা,গোন্নাসেরান্দী,পুন্দরা,
বন্দর,বালিগুনি,আঙ্গোরা গ্রামগুলি চারিদিকে অবস্থান করলেও, প্রত্যেকটি গ্রামেরই দুরত্ব এখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার। এখনও শিশুরা দুষ্টুমি করলে, ভয় দেখিয়ে মায়েরা বলেন, 'চল তোকে ভূরভুরি ডাঙ্গায় দিয়ে আসব।' আগে এতটাই আতঙ্কের পরিবেশ ছিল যে, দিনে দুপুরে ওই স্থান পেরোতে হলেও দুইবার ভাবতো , আর তার মূলে ছিল অবশ্যই ওই মহাশ্মশান। প্রায় পনের একর জায়গা জুড়ে মহাশ্মশানের বিভিন্ন স্থানে মাটি খুঁড়লে এখনও দেখা মেলে মানুষের হাড়-গোড়।বর্তমানে মহাশ্মশানের একপ্রান্তে খাদ্যদপ্তর নির্মাণ করছে একটি গুদামঘর। আর আশ্রমের দক্ষিণ দিকে তৈরি হয়েছে একটি সরকারি আইটিআই কলেজ।যেগুলি কে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে এলাকাবাসী।তারা স্বপ্ন দেখছে ভুরভুরে ডাঙ্গা ও মহাশ্মশান সংলগ্ন স্থানকে সুন্দর করে সাজানোর। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন এই মহাশ্মশান ছিল এলাকার দরিদ্র মানুষদের মৃতদেহ বিসর্জনর একমাত্র স্থান। আশেপাশে বিশ-ত্রিশটি গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা তাদের নিকটজন বিয়োগ হলে এখানে এসে, হয় দাহ করতো নয়তো শব দেহ মাটি চাপা দিয়ে যেতে বাধ্য হতো। তৎকালীন সময়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাদের বাধ্য করতো এভাবেই প্রিয়জনদের সৎকার করতে।ভুরভুরি ডাঙ্গা ও মহাশ্মশান এর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া দুটি কান্দর অদূরেই মিলিত হয়েছে।আর সে কান্দরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল অসমতল ভূমিরূপ যার খানাখন্দেই মূলত পুঁতে দেওয়া হতো শবদেহগুলি।আর গভীর রাতে সেই শব দেহগুলি দিয়ে পেটের জ্বালা মেটাতো, শবদেহ ভক্ষণকারী পশুপক্ষীরা, আর তাতেই ইতস্তত ছড়িয়ে থাকতো হাড়গোড়, দেহাবশেষ, যা শ্মশান ভূমিকে এক বিভীষিকাময় পরিবেশের রূপ দিয়েছিল।
শ্মশান সংলগ্ন স্থানের ভুরিশ্রবা আশ্রম সাধক ও সাধারণ মানুষের কাছে এক অত্যন্ত পবিত্র স্থান।লোকমত অনুসারে- মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় পান্ডবপক্ষের দ্বারা ছিন্ন হওয়া শিবভক্ত রাজা ভুরিশ্রবার মস্তক পতিত হয় এই স্থানে। শিব শিব ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে ভুরিশ্রবার ছিন্ন মস্তক এখানে পতিত হলে,সৃষ্টি হয় অজস্র প্রস্রবণ। সেই প্রস্রবণ থেকে নিঃসৃত জলধারা ভুরিশ্রবার মস্তক ধৌত করে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন আজও এখানে কান পাতলে শোনা যায় শিব শিব ধ্বনি।আর একসময় এখনে অজস্র প্রস্রবণ থাকলেও, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত কয়েকটি প্রস্রবণ থেকে প্রায়ই জল বের হতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।এখনও ভরা বর্ষায় প্রস্রবণ গুলোর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, আর প্রস্রবণ গুলি কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বেশ কয়েকটি কুন্ডু এখনো বর্তমান।
কথা হচ্ছিল আশ্রমের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কিছু মানুষদের সঙ্গে। সদ্য বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধে, চারদিকে ঘন অন্ধকারের মধ্যে মন্দির প্রাঙ্গণে বসে স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন বর্ষিয়ান ফণীভূষণ ঠাকুর, আজ থেকে প্রায় সত্তর পঁচাত্তর বছর আগে এখানে আসেন সাধক সীতারামদাস, অল্পভাষী সীতারাম বাবা পিতলের বাঁশি বাজাতে বাজাতে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। সঙ্গে থাকত মহিষের শিং দ্বারা নির্মিত আরো একটি শিঙা।' সীতারাম বাবা ছিলেন একজন বৈষ্ণব সাধক, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে একই সময়ে আশ্রমেই থাকতেন বিশ্বনাথ গিরি নামে একজন শাক্ত সাধক, যিনি সম্ভবত বীরভূমেরই ভূমি পুত্র ছিলেন।সাধনা গত জগতে উভয় দুই মেরুর হলেও, দুজনের মধ্যে মিল ছিল প্রচণ্ড, সীতারাম বাবা পূজা শুরু করতেন গঙ্গা জল দিয়ে, আর বিশ্বনাথ গিরি ব্যবহার করতেন কারণ বারি। যদিও বিশ্বনাথ গিরি মাঝেমধ্যেই নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন, ভ্রমণ করতেন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান।যদিও পাকাপাকিভাবে আশ্রমে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না তবুও বিশ্বনাথ গিরিকে কেন্দ্র করেই অনেক কাহিনী আজও ঐ এলাকায় শোনা যায়। কৌতুহলী গ্রামবাসীকে অসময়ে আমশোল খাওয়ানো, অল্প প্রসাদে বহুজনকে পেটভরে সেবা করানোর মতো ঘটনার কাহিনী আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আশ্রমের পশ্চিম প্রান্তে এক বিশাল বৃক্ষ তলে পঞ্চমুন্ডির আসনটি স্থাপন করেছিলেন বিশ্বনাথ গিরি স্বয়ং। নিয়মিত সাধনা করতে ঐ আসনে বসে।
পরবর্তীকালে আশ্রমে আসেন মুনি বাবা ও মুনি মা, ছিলেনও বেশ কিছুদিন।তবে আশ্রমের মুখ্য উৎসব বাসন্তী পূজা কিন্তু শুরু হয় গোবিন্দানন্দ ব্রহ্মচারীর সময়কালে,সে বছর প্রথমে হয়েছিল অন্নপূর্ণা পূজা কিন্তু পরবর্তীকালে নিয়মিত ভাবে আসতে শুরু করে বাসন্তী পূজা। সেরান্দির রমেন্দ্রনাথ গুপ্ত, তমালকৃষ্ণ মন্ডল, মুইতিনের শংকর ঘোষ প্রমূখ ব্যক্তিদের উদ্যোগে ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় শুরু হওয়া বাসন্তী পূজার প্রথম পুরোহিত ছিলেন গোলোকবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ও ফনীভূষন ঠাকুর।কিন্তু গোবিন্দানন্দ ব্রহ্মচারীর পর সেই অর্থে পাকাপাকিভাবে কোন সাধক এখানে ছিলেন না। তবে প্রত্যেক বছর বাসন্তী পূজার সময় পূজা পরিচালনার জন্য আসতেন মারুট আশ্রম থেকে গোবিন্দানন্দ ব্রহ্মচারীর গুরু ভাই ব্রতানন্দ ব্রহ্মচারী। তবে বর্তমানে আশ্রমের দায়িত্বভার নিয়েছেন সিদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী ও তার সহযোগী ধনঞ্জয় পাল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এলাকাবাসী কখনোই পূজা বন্ধ করেনি। বাসন্তী পূজার সময় হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বসে মেলা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অন্যান্য গ্রামীণ মেলা গুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যেতে বসলেও এই মেলা কিন্তু অন্যরকম। এই ফাঁকা মাঠেও বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেমন আসেন, ঠিক তেমনি আশেপাশের গ্রাম সহ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন হাজির হন এই মেলার টানে। ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে একটি ট্রাস্টি বোর্ড মূলত তাদের পরিচালনায় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে এক সুবৃহৎ মন্দিরের। মনে করা হচ্ছে মন্দিরটি সম্পূর্ন হলে,এটি হবে বীরভূমের অন্যতম আকর্ষণ। আশ্রম সংলগ্ন স্থানে একটি ইকো পার্কের প্রস্তাব রেখেছে এলাকাবাসীরা, আগামীতে সেটিও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সব মিলিয়ে আগামী দিনে এই পবিত্রক্ষেত্র সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পাবে এবং এই পবিত্র ভূমি স্পর্শে, নিজেদের ধন্য করতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজির হবেন পূণ্যার্থীরা। এ সম্পর্কে আশাবাদী ভুরিশ্রবা আশ্রম পরিচালন কমিটি থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই।
আনন্দবাজার পত্রিকা
১৩/০৪/১৯
Comments
Post a Comment